কৃষিঋণ মওকুফ

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ইতিবাচক পদক্ষেপ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের মাত্র ১০ দিনের মাথায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্তটি একটি সময়োচিত এবং ইতিবাচক পদক্ষেপ। বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকেই নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয় নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং প্রান্তিক কৃষকের মেরুদণ্ড শক্তিশালী করার বলিষ্ঠ প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে। ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার এই ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পাবেন দেশের প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, যা গ্রামীণ জনপদে স্বস্তি ও নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করবে।

নির্বাচনী প্রচারণায় একাধিক জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের ঘোষণা দেন। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপি ২০৯ আসনে বিজয়ী হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করার পর বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত হলো।  

শস্য, মৎস্য ও পশুপালন খাতের ক্ষুদ্র চাষিরাই আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। কিন্তু মহাজনি ঋণের উচ্চ সুদ এবং ব্যাংকের কিস্তির চাপে অনেক সময়ই তাঁরা দিশাহারা হয়ে পড়েন। এই মওকুফ প্রক্রিয়ার ফলে কৃষকের মাথায় থাকা ঋণের পাহাড় যেমন অপসারিত হলো, তেমনি তাঁদের ‘ক্রেডিট রেকর্ড’ বা ঋণমানও উন্নত হবে। এতে তাঁরা আবার ব্যাংক থেকে বৈধ উপায়ে ঋণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন, যা তাঁদের স্থানীয় শোষক মহাজনদের কবল থেকে রক্ষা করবে। পাশাপাশি কিস্তির টাকা সাশ্রয় হওয়ায় সেই অর্থ উন্নত বীজ, সার বা আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে, যা প্রকারান্তরে দেশের মোট কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের একটি মানবিক দিকও রয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টার ভাষ্যমতে, ঋণের দায় থেকে মুক্তি পাওয়ায় প্রান্তিক পরিবারগুলো এখন বাড়তি অর্থ সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে পারবে। এটি বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়নের যে দর্শন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল, তারই প্রতিফলন। এ ছাড়া আগামী ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর যে ঘোষণা এসেছে, সেটিও গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

তবে যেকোনো ঋণ মওকুফ কর্মসূচির কিছু দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ থাকে। অর্থনীতিবিদেরা যেমনটি বলছেন, ঢালাও ঋণ মওকুফ যেন ভবিষ্যতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। যাঁরা নিয়মিত ঋণ শোধ করেন, তাঁরা যাতে বৈষম্যের শিকার বোধ না করেন, সে জন্য তাঁদের জন্য কোনো উৎসাহমূলক সুবিধা রাখা যায় কি না, তা ভাবা প্রয়োজন। এ ছাড়া শুধু ঋণ মওকুফই যথেষ্ট নয়; কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং শস্যবিমা চালুর মতো কাঠামোগত সংস্কারগুলোও সমানতালে চালিয়ে যেতে হবে।

১৯৯১ সালেও তৎকালীন সরকার ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করে কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সময়ের চাহিদায় এবার সেই অঙ্ক ১০ হাজারে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের গ্রাহকেরাও এই সুবিধার আওতায় আসায় এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। আমরা আশা করি, এই পদক্ষেপের সুফল যেন প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকের কাছে স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছায়। সরকারের এই পদক্ষেপ কোনোভাবেই যেন সুযোগের অসদ্ব্যবহার না হয়, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। সরকারের এই জনবান্ধব উদ্যোগ সফল হলে তা কেবল কৃষি খাত নয়, বরং পুরো জাতীয় অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে।