মে মাসের তুলনায় জুন মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যু লাফিয়ে বেড়েছে। এ বছর এপ্রিল মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে টানা বৃষ্টির চেয়ে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিবেশ ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। সরকারি–বেসরকারি জরিপেও উদ্বেগজনকভাবে এডিস মশার উচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে এডিস মশা নিধনে ও ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী তিন–চার মাস নাগরিকদের জন্য যে ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে, সেটা বলা বাহুল্য।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, প্রাক্–বর্ষা জরিপে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় এডিস মশার লার্ভা বা শূককীটের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ড ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ; এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড অতি ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা উত্তর সিটির ওয়ার্ডগুলোর গড় ব্রুটো ইনডেক্স ৪০–এর ওপরে। চট্টগ্রাম নগরীর গড় ব্রুটো ইনডেক্স ৩১–এর ওপরে। এর অর্থ ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রামের বেশির ভাগ এলাকা ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো, বিশেষ করে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর ও কক্সবাজারের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
এডিস মশার বংশবিস্তারের প্রাক্–বর্ষা জরিপের উদ্বেগজনক তথ্যের সঙ্গে সংক্রমণের চিত্রও মিলে যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের মোট শনাক্ত হওয়া ডেঙ্গু রোগীর প্রায় অর্ধেকটাই ছিল জুন মাসে। ফেব্রুয়ারি–মে মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে যেখানে ৩ জন মারা গেছেন, সেখানে জুন মাসেই মারা গেছেন ১৩ জন। এসব তথ্য নিশ্চিত করে আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো ও স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য বড় এক সতর্কবার্তা।
ডেঙ্গু যে কত বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটাতে পারে ২০১৯, ২০২২ ও ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতা তার কাছের উদাহরণ। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ডেঙ্গু, করোনা মহামারি, হামের মতো স্বাস্থ্যগত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য মোটেই সক্ষম নয়। হামের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, একটা আইসিইউ বেডের জন্য উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে বিভাগ, বিভাগ থেকে ঢাকার এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। আইসিইউর সিরিয়াল পাওয়ার আগে প্রিয় সন্তানেরা চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাচ্ছে। হামের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে হামের সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণ একই সমান্তরালে বাড়তে থাকলে আমাদের সীমিত সম্পদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর যে বড় চাপ পড়বে, তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনামের মতো দেশ অনেকটাই সফল হলেও বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ না থাকায় বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিলেও প্রচারণা ও কিছু অভিযানের বাইরে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো জোরালো ও সমন্বিত পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ডেঙ্গু যে সারা বছর ও দেশব্যাপী একটি অসুখ, সেই স্বীকৃতিই এখন পর্যন্ত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মেলেনি। এখনো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। রোগী, মশা ও পরিবেশ—রোগতাত্ত্বিক এই ত্রিভুজ অটুট রেখে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
জুন মাসে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী সূচক সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জন্য সতর্ক ও সজাগ হওয়ার একটি ঘণ্টাধ্বনি। আমরা মনে করি, কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ নিয়ে জনগণকে সম্পৃক্ত করে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে এডিস মশা নির্মূলে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করা প্রয়োজন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের যেন সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া যায়, সে জন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে এখনই প্রস্তুত করতে হবে। সরকারের সক্রিয়তা ও নাগরিকদের সচেতনতাই পারে ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আটকে রাখতে।