ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) দেশি পর্যবেক্ষকদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, তা কেবল বিস্ময়করই নয়; বরং আসন্ন নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে শুরুতেই চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একটি ‘নামসর্বস্ব’ এনজিও, যার নেই কোনো স্থায়ী জনবল, নেই কোনো স্বীকৃত প্রকল্প এবং যার প্রধানের বসতবাড়ির একটি কক্ষই হলো ‘কার্যালয়’; সেই সংস্থাকে দেশের মোট পর্যবেক্ষকের ১৯ শতাংশ নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অতীতের মতো এবারও নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নামে এমন তামাশা কেন?
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের অখ্যাত এনজিও ‘পাশা’ (পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট) একাই ১০ হাজার ৫৫৯ জন পর্যবেক্ষক মোতায়েন করবে। অথচ অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, এই সংস্থার এনজিও ব্যুরোর কোনো অনুমোদন নেই, নেই কোনো পেশাদার অবকাঠামো। এমনকি অতীতে টাকার বিনিময়ে পর্যবেক্ষক কার্ড বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে সংস্থাটির বিরুদ্ধে। যেখানে নামকরা অনেক এনজিওর পর্যবেক্ষক সংখ্যা এক হাজারের কোঠায় পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে পাশার এই ‘অলৌকিক সক্ষমতা’ দেখেও ইসির নির্বিকার থাকা রহস্যজনক।
বহুল কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত জাতীয় নির্বাচনের আর এক সপ্তাহও নেই। নির্বাচনে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রচারণায় অতি ব্যস্ত সময় পার করছে। নির্বাচন কমিশনও তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে এনেছে। নির্বাচনের নিরাপত্তায় যৌথ বাহিনীও মাঠে নেমে গেছে। এখন সবার একটাই দাবি—সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ একটি নির্বাচন। এখানে নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটের দিন নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; কিন্তু ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা কেবল ‘কাগজে-কলমে শর্ত পূরণ’ দেখেই অনুমোদন দিয়েছেন। বাস্তবে সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ে কোনো সক্ষমতা আছে কি না, তা যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করেননি তাঁরা। এই ‘ব্যত্যয়হীন’ অনুমোদন আসলে কার স্বার্থে? ১০ হাজার অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তি, যাঁদের অনেকেরই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা নেই, তাঁরা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে কী পর্যবেক্ষণ করবেন? নাকি তাঁরা কেবল নির্দিষ্ট কোনো পক্ষকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ‘মানবঢাল’ হিসেবে কাজ করবেন?
২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও আমরা দেখেছি, কীভাবে ‘ইলেকশন মনিটরিং ফোরাম’ বা ‘সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন’-এর মতো বিতর্কিত সংস্থাগুলো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু ও সুন্দর’ বলে সার্টিফিকেট দিয়েছিল। বিদেশি পর্যবেক্ষকের নামেও যে কেলেঙ্কারি হয়েছিল, তা ইতিহাসের পাতায় কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে আছে। এবারও কি একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে? ১২৭টি সংসদীয় আসনে ‘পাশা’র মতো দুর্বল সংস্থার একক আধিপত্য নির্বাচনকে বিতর্কিত করার পথই কি প্রশস্ত করছে না?
অতীতের বিতর্কিত উদাহরণ থাকা সত্ত্বেও ইসি কেন বিষয়টি যাচাই–বাছাই করে দেখল না? নাকি শর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে আছে? চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর জাতীয় এই নির্বাচন নিয়ে ইসির পদক্ষেপে এমন বিতর্ক তৈরি হবে, তা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। নির্বাচন কমিশনের মনে রাখা উচিত, নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি জনমতের প্রতিফলন। পর্যবেক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য বা কোনো বিশেষ মহলের প্রেসক্রিপশন যদি বিবেচ্য হয়, তবে সেই নির্বাচন কখনো গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
একটি ‘ওয়ান ম্যান শো’ এনজিওকে বিপুলসংখ্যক পর্যবেক্ষকের অনুমোদন দেওয়া ইসির সক্ষমতা ও সততাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। আমরা দাবি করি, অবিলম্বে এই নামসর্বস্ব সংস্থাগুলোর অনুমোদন বাতিল করে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য পর্যবেক্ষকদের সুযোগ দেওয়া হোক।