সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

গাজী টায়ার্সে অগ্নিকাণ্ড

নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দিন

একটি রাষ্ট্রের মানবিকতার সর্বোচ্চ প্রমাণ তার দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের মুহূর্তে নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে নিহিত থাকে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ার্স কারখানার ছয়তলা ভবনে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পেরিয়ে গেলেও ১৮২ জন নিখোঁজ মানুষের কোনো সন্ধান মেলেনি; তাঁদের পরিচয় শনাক্তকরণে প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপও দেখা যায়নি। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক শোচনীয় ব্যত্যয়।

এই ঘটনার তদন্তে অগ্নিসংযোগের প্রমাণ মিললেও অভিযুক্তদের পরিচয় শনাক্তকরণে কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি হয়নি। আরও বেদনাদায়ক হলো, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবন অপসারণ ও অস্থি উদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়নি। ফলে স্বজনেরা এক বছর ধরে অপেক্ষারত। তাঁদের প্রিয়জনদের মৃত্যুসনদ নেই, দাফন নেই, নেই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে অসহায় পরিবারগুলো প্রতিদিন দুঃখ ও বঞ্চনার দ্বৈত যন্ত্রণা বহন করছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, অসংখ্য নারী স্বামী হারিয়েও বিধবা ভাতার জন্য আবেদন করতে পারছেন না। এনজিও ঋণ মওকুফ হয়নি, কারণ তাঁদের হাতে কোনো মৃত্যুসনদ নেই। সমাজে একজন মানুষের মৃত্যুর পর ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে যে আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শোককে সান্ত্বনায় রূপান্তরিত করা হয়, সেই অধিকার থেকেও বঞ্চিত তাঁরা। এমনকি সন্তানদের মুখে আহার জোগাতে মায়েদের কারখানায় কাজ করতে হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেই কোনো ক্ষতিপূরণ কিংবা সামাজিক সুরক্ষার আশ্বাস।

আমরা দেখছি যে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তদন্ত সম্পর্কে অজ্ঞতার অজুহাত দেখাচ্ছেন, পুলিশের অনুসন্ধানও অগ্রগতিহীন। এটি কেবল প্রশাসনিক শৈথিল্য নয়, মানবাধিকারের প্রতি গভীর অবহেলা।

এ অবস্থায় এখন রাষ্ট্র ও প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভবন অপসারণ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের অস্থি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু করা; নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ ঘোষণা এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান; নিখোঁজদের স্বজনদের জন্য বিনা শর্তে ঋণ মওকুফ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং এই অগ্নিসংযোগে জড়িতদের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান।

মনে রাখতে হবে, শোকাহত মানুষের হৃদয়ে রাষ্ট্র সান্ত্বনার আলো জ্বালাতে সক্ষম হলে তবেই মানবিকতার মর্যাদা রক্ষা পায়। সেই মর্যাদা সরকারকেই রক্ষা করতে হবে।