সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

বেতনহীন অনেক শ্রমিক

ঈদের আগেই পাওনা মেটাতে হবে

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার প্রধান কারিগর আমাদের সাধারণ শ্রমিকেরা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাঁরা রপ্তানি আয়ের ঝুলি সমৃদ্ধ করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, প্রতিটি উৎসবের আগেই তাঁদের পাওনা পরিশোধ নিয়ে একধরনের টানাপোড়েন ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া যেন এ দেশে এক অলিখিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। এবারের ঈদুল ফিতর সামনে রেখেও এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখনো ৩২ শতাংশ কারখানায় ফেব্রুয়ারির বেতন এবং ৬৩ শতাংশ কারখানায় ঈদ বোনাস বকেয়া রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এবার যথেষ্ট সদিচ্ছা দেখানো হয়েছে। ৯ মার্চের মধ্যে বেতন এবং ১২ মার্চের মধ্যে বোনাস দেওয়ার নির্দেশনা ছিল স্পষ্ট। শুধু নির্দেশনাই নয়, মালিকদের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক সচল রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছে। বকেয়া নগদ সহায়তার ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকাও ছাড় করা হয়েছে। এত কিছুর পরও কেন এক-তৃতীয়াংশ কারখানার শ্রমিকেরা ঈদের আগমুহূর্তে অনিশ্চয়তায় থাকবেন? সরকারের এই বিপুল আর্থিক সহায়তার পর পাওনা আটকে রাখার কোনো যৌক্তিক অজুহাত থাকতে পারে না মালিকপক্ষ থেকে। শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, মালিকদের একটি অংশ ইচ্ছা করেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পাওনা আটকে রাখে। মালিকদের মধ্যে এমন প্রবণতা থেকে যেভাবেই হোক বেরিয়ে আসতে হবে।

শিল্প পুলিশের প্রতিবেদনে ১৮০টি পোশাক কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এবং তিন শতাধিক কারখানায় জানুয়ারির বেতনও বকেয়া থাকার তথ্যটি চরম উদ্বেগজনক। যে শ্রমিক সারা বছর শ্রম দিয়ে মালিকের মুনাফা নিশ্চিত করেন, উৎসবের সময় তাঁকে কেন রাজপথে দাঁড়িয়ে নিজের ন্যায্য পাওনার জন্য চিৎকার করতে হবে? এটি একটি সভ্য জাতির জন্য লজ্জাজনক।

তৈরি পোশাক খাতের মালিক সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ বলছে, বেশির ভাগ কারখানা বেতন দিয়েছে এবং বাকিগুলো ছুটির আগেই দিয়ে দেবে। তাদের এই আশ্বাস যেন কেবল কাগুজে কথায় সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যেসব কারখানা ‘নন-কমপ্লায়েন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত, সেগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সরকারের দায়িত্ব কেবল নির্দেশনা জারি বা ঋণসুবিধা দেওয়াতেই শেষ হয় না; সেই অর্থ প্রকৃত অর্থে শ্রমিকের হাতে পৌঁছাল কি না, তা–ও তদারক করতে হবে।

ঈদের আনন্দ কেবল মালিক বা উচ্চবিত্তের জন্য নয়; তা শ্রমিকের ঘরেও পৌঁছানো মালিকপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব এবং শ্রমিকের আইনগত অধিকার। আমরা আশা করি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই সব কারখানা তাদের বকেয়া পরিশোধ করে শ্রমিকদের স্বস্তির ঈদযাত্রা নিশ্চিত করবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, শিল্প পুলিশ এবং মালিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত তৎপরতাই পারে সবার জন্য একটি উৎসবমুখর ঈদ উপহার দিতে। শ্রমিকের কান্না যেন উৎসবের রং ফিকে করে না দেয়।