২০ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে ভাড়া নিয়ে যে নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে, সেটাকে নাগরিকদের ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’ই বলা চলে। সরকার বাসভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ালেও অনেক রুটে বাসমালিকেরা সেটা মানছেন না। লঞ্চের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২৩ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। যদিও সরকারি ঘোষণার আগেই বিভিন্ন রুটে লঞ্চের ভাড়া ১৭ থেকে ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে দেন মালিকেরা। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়েছেন ইচ্ছেমতো। পরিবহন খাতে ভাড়ার এই নৈরাজ্য নাগরিকদের বাড়তি চাপ ও অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠেছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির যে প্রতিক্রিয়া, তা সামাল দেওয়ার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজার অনেক চড়া। এ ছাড়া পরিবহন ও বিমা খরচও বেড়েছে। এ বাস্তবতায় সরকার এপ্রিল মাসে প্রথম দফা ও ২০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায়। শুল্ক ও করের চাপ কমিয়ে তেলের দাম সমন্বয়ের সুযোগ থাকার পরও লিটারে একলাফে ২০ টাকা বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেননা, দেশে যখন টানা চার বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে, এর ফলে দারিদ্র্য থেকে মধ্যবিত্ত—সব শ্রেণির নাগরিকদের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রথম অভিঘাতটা আসে পরিবহন খাতে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের মালিকেরা এটিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে দেন। এবারও তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, মঙ্গলবার বিআরটিএ ভাড়া সমন্বয়ের ঘোষণা দেওয়ার আগেই অনেক পরিবহনে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া শুরু হয়। রাজধানীর বাসগুলোতে ৫ থেকে ১০ টাকা ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসে রুটভেদে ৫০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে।
শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস এবং পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় মালিকেরা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়েছেন। চট্টগ্রাম, যশোর, কুষ্টিয়া থেকে ঢাকামুখী ট্রাকে এরই মধ্যে দুই হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ভাড়ার এই নৈরাজ্য যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহনের চালক ও সহকারীদের মধ্যে সংঘাতময় পরিবেশ তৈরি করেছে।
জ্বালানি তেল কৌশলগত পণ্য। এর দাম বাড়লে তার প্রতিক্রিয়ায় পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, কৃষি, সেবা, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য—সবকিছুরই দাম বাড়ে। নতুন মূল্যস্ফীতির ঢেউ আছড়ে পড়ে। আগস্টেই দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ।
অর্থনীতির এই নাজুক সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ও তেলের বড় মূল্যবৃদ্ধি, এই দুই সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতি আবারও দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ফলে দেশের সিংহভাগ নাগরিকের জীবনযাপনের সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে যেটুকু ব্যয় বেড়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়ের বোঝা নাগরিকদের ঘাড়ে যাতে চেপে না বসে, তার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্যি, ভাড়া বেঁধে দেওয়া কিংবা জিনিসপত্রের দামে তেমন প্রভাব পড়বে না, এমন বক্তব্য ছাড়া সরকারের দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর পরিবহন খাতে ভাড়া নিয়ে যে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে, সেটা বন্ধ করা সম্ভব না হলে একদিকে যেমন নাগরিকদের যাতায়াতে ব্যয় বেড়ে যাবে, অন্যদিকে পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। সরকারকে অবশ্যই এই ভাড়ানৈরাজ্য থামাতে হবে।