বিনিয়োগে বাধা জ্বালানিসংকট

প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল 

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট। শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এমনকি নতুন বিনিয়োগ—এ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ। অথচ বাস্তবতা হলো, অনুমোদন পাওয়ার পরও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাস–সংযোগের অপেক্ষায় বছরের পর বছর বসে আছে। ফলে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোতেও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যয় বাড়ছে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কেবল ব্যবসায়ীদের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।

বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে সেই বাস্তব চিত্রই উঠে এসেছে। তাঁদের বক্তব্যে একটি বিষয়ে প্রায় সর্বসম্মত মত পাওয়া গেছে—জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেই দেশের অর্থনীতি চাপে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার ঘটনা এই নির্ভরতার ঝুঁকিই আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

এ বাস্তবতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করেছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর জ্বালানি খাতে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব ছিল। দেশি গ্যাস অনুসন্ধান উপেক্ষিত হয়েছে, জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে এবং গ্যাস আমদানির প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও যথাসময়ে গড়ে ওঠেনি। তবে তিনি একই সঙ্গে আশ্বস্ত করেছেন যে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশি গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।

উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার গ্যাস চুরি হয় বলে বিভিন্ন সময়ে সরকারি পর্যায়েই তথ্য উঠে এসেছে। একদিকে শিল্পে গ্যাসের অভাব, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস অবৈধভাবে অপচয় বা চুরি—এই বৈপরীত্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গ্যাস চুরি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্মার্ট মিটারিং, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। নতুন গ্যাস উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও আইইউবির উপাচার্য ম. তামিম যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা প্রাথমিক জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা। পুরোপুরি জ্বালানি স্বাধীনতা সম্ভব না হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে এই নির্ভরতা কমানো যেতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। দেশি গ্যাস, এলএনজি, সৌর, বায়ুশক্তিসহ বিভিন্ন উৎসকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

নিয়মিত, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা শুধু শিল্পের স্বার্থে নয়, দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্যও অপরিহার্য। এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন আর খণ্ডিত উদ্যোগে কাজ হবে না। দ্রুত নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্থল ও সমুদ্রে আধুনিক জরিপ, সম্ভাবনাময় এলাকায় নতুন কূপ খনন, এলএনজি আমদানির অবকাঠামো সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, গ্যাস চুরি বন্ধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ—সব বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।