সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

সন্তোষপুর ইকোপার্ক

বনাঞ্চল ও কৃষি উভয়ই রক্ষা করা হোক

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুরের প্রাকৃতিক শালবন ধ্বংসের ইতিহাস এ দেশের বন ধ্বংসের এক করুণ দলিল। একসময় যা ছিল সাড়ে তিন হাজার একরের বেশি বিস্তৃত এক গভীর অরণ্য, যেখানে বিচরণ করত বিভিন্ন বন্য প্রাণী। কালের বিবর্তনে মানুষের বসতি বিস্তার, অনিয়ন্ত্রিত চাষাবাদ ও দখলদারির কবলে পড়ে সেই প্রাকৃতিক শালবন আজ এসে ঠেকেছে মাত্র ৫০ একরে। সম্প্রতি এই বনাঞ্চলকে ইকোপার্ক ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বনাঞ্চলটি সংরক্ষণ প্রক্রিয়া টেকসই হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের অধীনে এই বনাঞ্চলের ৫৬৫ একর এলাকাকে ‘ইকোপার্ক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিলুপ্তপ্রায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে সরকারের এই সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে প্রশংসনীয় হলেও প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অধিবাসী ও কৃষকদের মধ্যে জীবিকা হারানো এবং বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও বনাঞ্চল ধ্বংস করেই সেখানে মানুষের পদচারণ এবং কৃষিসহ নানা কর্মকাণ্ড তৈরি হয়েছে।

সন্তোষপুর বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে একটি বিশাল স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন ও কৃষি বনায়ন কর্মসূচির আওতায় প্রায় দেড় হাজার পরিবার সরাসরি যুক্ত। আনারস, হলুদ, কলা ও লেবু চাষের মাধ্যমে এই বনাঞ্চল ঘিরে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। ইকোপার্কের সীমানাপ্রাচীর, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বা পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে এই কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রা থমকে যেতে পারে বলে দুশ্চিন্তায় আছেন সেখানকার মানুষেরা।

উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার এই উদ্যোগ সফল করতে হলে রাষ্ট্রকে পরিবেশগত সুফলের পাশাপাশি মানুষের বাঁচা–মরার সুরক্ষাকে সমান প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা আশা করব ইকোপার্কটি পরিবেশবান্ধব ও কৃষিবান্ধবভাবে গড়ে তোলা হবে। কেবল পর্যটনকেন্দ্রিক বা ইট-পাথরের অবকাঠামো তৈরি করে ইকোপার্কের নামে পরিবেশের ক্ষতিসাধন করা এ দেশে নতুন নয়। ফলে গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী, এই ইকোপার্ককে যেন শুধু বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে না তুলে পরিবেশ গবেষণা ও স্থানীয় লোকজনের কৃষিনির্ভর জীবিকাকে সুরক্ষা দেওয়ার সমন্বিত মডেল হিসেবে দাঁড় করানো হয়।

সামাজিক বনায়নে যুক্ত স্থানীয় লোকজনকে বাদ না দিয়ে বরং তাঁদের ইকোপার্কের রক্ষক ও অংশীদার হিসেবে রাখা যেতে পারে। বিদ্যমান আনারস বা হলুদ চাষকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে বজায় রেখে বনের সৌন্দর্য রক্ষা করা সম্ভব। সামাজিক বনায়নের নামে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর গাছপালা লাগানো নিরুৎসাহিত করতে হবে। বন ও কৃষির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গাছপালা লাগানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কংক্রিটের নামে অহেতুক কোনো প্রকল্প করা যাবে না। ইকোপার্কটি সত্যিকার অর্থেই হোক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যবান্ধব।