দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নেওয়া ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘুরেফিরে কিছু সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করে প্রকল্প নেওয়া, প্রকল্প বাস্তবায়নের সামর্থ্য না থাকা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ, নকশায় ত্রুটি, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিশেষে যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন, তা অনেক সময় পূরণ না হওয়া। এ নয় যে সরকারি নীতিনির্ধারণী বৈঠক ও প্রতিবেদনে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয় না। এরপরও আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এসব সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। যেমনটি আমরা দেখছি দুর্যোগ অধিদপ্তরের দেশজুড়ে ১৩ হাজার সেতু-কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার আগেই অনেক জায়গায় নির্মিত সেতু বা কালভার্ট ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, নানা কারণে সময়মতো দরপত্র আহ্বানে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদও দুই বছর বেড়ে যায়। ২০২৪ সালের জুনে এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৫০ শতাংশ। ফলে বাকি সময়ে বাকি অর্ধেক কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এই প্রকল্পের অধীনে ১২ মিটার পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের বক্স কালভার্ট হবে ৭ হাজার ৮০০টি। এর মধ্যে ৬ হাজার ৪২৭টি কালভার্টের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আর ১২ মিটারের বেশি গার্ডার সেতু হবে ৫ হাজার ২০০টি। এর মধ্যে মাত্র ৪৬৪টির কাজ শেষ হয়েছে।
দুর্যোগ অধিদপ্তরের এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এত বড় প্রকল্পটি নেওয়াই হচ্ছে কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা ছাড়া। ফলে অনেক জায়গায় নির্মিত সেতু ও কালভার্ট দুই পাশের সংযোগ সড়ক দেবে গেছে বা মাটি সরে গেছে। এমনকি যেখানে দরকার, সেখানে না হয়ে নির্মিত হয়েছে অন্য জায়গায়। ফলে সেসব সেতু বা কালভার্ট মানুষ ব্যবহারও করছে না। আরও ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, সেতু করতে গিয়ে অনেক খাল সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে খালগুলো মেরে ফেলারই আয়োজন করা হয়েছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নে এমন বিশৃঙ্খলা উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন হচ্ছে, সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া এত বড় প্রকল্প কীভাবে নেওয়া হলো। আর সব জায়গায় একই নকশায় সেতু করার মতো এমন অবিবেচক সিদ্ধান্ত কেন? যদি মানুষেরই উপকারে না আসে, উল্টো প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি হয়, তাহলে এমন প্রকল্প কেন নেওয়া হলো? কীভাবেই-বা সেই প্রকল্প পাস হলো? এভাবে জনগণের অর্থ অপচয়ের কোনো মানে হয় না। এখন দেখার অপেক্ষা দুর্যোগ অধিদপ্তর প্রকল্পটির বাকি অংশ কীভাবে বাস্তবায়ন করে।