সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

‘মৃতের চিৎকার’

অপরিকল্পিত খননে ব্রহ্মপুত্র বাঁচবে না

যত অর্থই খরচ করা হোক না কেন, অপরিকল্পিত খনন যে কোনো কাজে আসে না, তার প্রমাণ ব্রহ্মপুত্র নদ। ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। খননের দাবিতে আন্দোলন চলেছে ২০০৯ সাল থেকে।

কিন্তু চার বছর পরও নদে নাব্যতা ফিরে আসেনি। এ ছাড়া নদের পুরোটা খনন না করে প্রস্থে মাত্র ১০০ মিটার খনন করা হচ্ছে। খননের পর নদের পাশে বালু রাখা হচ্ছে, বর্ষার সময় যা আগের জায়গায় গিয়ে পড়ছে।

গত শুক্রবার নদের বুকে হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান ময়মনসিংহ শহর ও কয়েকটি উপজেলা থেকে আসা তরুণ-তরুণীরা। ‘মৃতের চিৎকার’ শিরোনামে প্রতীকী ওই কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। শনিবার ‘জনউদ্যোগ’ নামের একটি নাগরিক সংগঠন নদের বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করে খননকাজের অসংগতি অনুসন্ধান করে।

নাগরিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নদের সংযোগস্থল বা উৎসমুখ খনন না করায় নাব্যতা ফেরেনি ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্র নদে। শুষ্ক মৌসুমে হেঁটেই পার হওয়া যায়।

নদীবিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রে প্রচুর পলি ঢোকে। শুধু এখানে-সেখানে মাটি কাটলে, খনন করলে কাজ হবে না। দীর্ঘ মেয়াদে সুফল পেতে হলে শুধু খননে কাজ হবে না। এ জন্য খননের সঙ্গে নদীশাসনকে যুক্ত করার তাগিদ দেন তিনি।

২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের অধীনে ২০১৯ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজ শুরু হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নদ খননের কাজটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। খননের উদ্দেশ্য সারা বছর যাতে নদে নাব্যতা বজায় থাকে এবং যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি ও মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে যাতে নদটি ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু চার বছর খননের ফলাফল শূন্য। তাহলে কি আক্ষরিক অর্থেই টাকা পানিতে গেছে?

প্রকল্পের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রের মোট ২২৭ কিলোমিটার অংশ খনন করার কথা। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্রের উৎসমুখ থেকে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার টোক পর্যন্ত এই ২২৭ কিলোমিটার খনন প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা।

খননের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহসিন মিয়া বলেন, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলের বিষয়টি তাঁদের পরিকল্পনায় আছে। চলতি বছরই সেখানে খননকাজ করা হবে। টোক থেকে ময়মনসিংহের পাটগুদাম এলাকার সেতু পর্যন্ত চলতি বছরের জুলাইয়ের মধ্যে খননকাজ শেষ হবে। এরপর আর নাব্যতাসংকট থাকবে না।

চার বছর খননকাজ চলার পর এখন কেন তিনি বলছেন যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের সংযোগস্থলের বিষয়টি পরিকল্পনায় আছে। ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলন কমিটি ২০০৯ সালে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদের উৎসমুখ পরিদর্শন করে যে সুপারিশ করেছিল, সেটি কেন তাঁরা আমলে নিলেন না?

ব্রহ্মপুত্র এক দিনে মুমূর্ষু নদে পরিণত হয়নি। নাব্যতা হ্রাসের পাশাপাশি দখল–দূষণও বাড়ছে। সংযোগস্থলে খনন করলেই হবে না, ব্রহ্মপুত্রে পানিপ্রবাহ বাড়বে না। নদের শাখা নদ ও খালগুলোও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কোনো একটি শাখা মারা গেলে তার বিরূপ প্রভাব ব্রহ্মপুত্রের ওপরও পড়বে।

আমরা মৃত ব্রহ্মপুত্রের চিৎকার শুনতে চাই না, জীবিত নদের কল্লোল দেখতে চাই। খননকাজ এমনভাবে করতে হবে, যাতে করে ব্রহ্মপুত্র প্রাণ ফিরে পায়। নদ-নদী বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে।