বৃষ্টিতে আবার ডুবল ঢাকা

জলাবদ্ধতা নিরসনে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

এবারে বর্ষা মৌসুমে ঢাকাবাসী যে জলাবদ্ধতার সমস্যায় চরম দুর্ভোগে পড়তে যাচ্ছেন, তার লক্ষণ আগেভাগেই বোঝা যাচ্ছিল। মে, জুন মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে, এরপরও বৃষ্টি হলেই ঢাকার অনেক সড়কে নিয়মিত জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। 

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, শনিবার দিবাগত রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত ঢাকায় প্রায় ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এই বৃষ্টিতে ঢাকার অনেক এলাকা ও সড়ক হাঁটু থেকে কোমরপানিতে তলিয়ে যায়। অনেক জায়গায় দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় জলাবদ্ধতা। এই বৃষ্টিতে জনজীবন যেভাবে স্থবির হয়ে পড়ে ও নগরবাসী যে দুর্ভোগে পড়েন, সেটা এককথায় দুর্বিষহ। এবারে বর্ষা মৌসুমের আগে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি, নগরবাসীর এই দুর্ভোগই তার ইঙ্গিত দেয়। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাস্তায় গণপরিবহন চলাচল সীমিত হয়ে যাওয়ায় সকালে অফিসগামী মানুষেরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।

অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতায় ঢাকা বহু বছর ধরে বাসযোগ্যতার তলানিতে থাকা বিশ্বের নগরগুলোর মধ্যে একটি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট গ্রুপের গবেষণা বিভাগ ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) সাম্প্রতিক সূচক বলছে, বাসযোগ্যতায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্ক ও ত্রিপোলি কেবল ঢাকার নিচে। এটা সত্যি যে মাত্র ৩৬০ বর্গকিলোমিটারের ঢাকায় প্রায় আড়াই কোটি নাগরিকের ভার বহন করার সক্ষমতা কোনোভাবেই নেই। নীতিনির্ধারকদের এই উপলব্ধিতে আসা জরুরি যে গ্রাম ও মফস্‌সলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়ালে এই প্রবণতা উল্টো দিকে ঘোরানো সম্ভব নয়।

কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টি হলেই ঢাকা ডুববে, এটাই যেন নগরবাসীর অবধারিত নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে বিগত সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা ও বিভিন্ন সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা নানা প্রতিশ্রুতি ও হাঁকডাক দিলেও বাস্তবে কোনো সমাধান হয়নি। নদী, খাল ও জলাশয়কেন্দ্রিক ঢাকায় একসময় পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থাটি ছিল পুরোপুরি প্রাকৃতিক। কিন্তু খাল ও জলাশয় ভরাট করে ঢাকার বিভিন্ন অংশ গড়ে উঠেছে, দখল ও দূষণে নদীগুলোও হয়ে পড়েছে সরু। 

খাল ও নদীকেন্দ্রিক ঢাকার পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেওয়ার ফলাফল আমরা এখন ভোগ করছি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সংস্থা বিচ্ছিন্নভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে। বাস্তবে সেই অর্থ ময়লা–আবর্জনায় ভরা খালের নোংরা পানি আর ঠিকাদারদের পকেটেই গেছে; নগরবাসী সামান্যতম সুফলও পাননি। শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের ক্ষেত্রেও কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নাগরিকদের দুর্ভোগ একবিন্দুও কমাতে পারেনি। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে টানা জলাবদ্ধতা তারই প্রমাণ দিচ্ছে।

ছোট–বড় পয়োনিষ্কাশনের নালা, বক্স কালভার্টও ঢাকার পানিনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলে, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে এসব নালা ও বক্স কালভার্ট ভালোভাবে পরিষ্কার করা হলে জলাবদ্ধতা সমস্যায় দুর্ভোগটা কিছুটা হলেও কমে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন দুই বছরের বেশি সময় ধরে মেয়রশূন্য। অন্তর্বর্তী আমলে ও বর্তমান সরকারের মেয়াদে প্রশাসক নিয়োগ করে কোনোরকমে রুটিন কাজ চলছে। আমরা মনে করি, নাগরিকদের সমস্যা সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়া ঢাকার দুই সিটির পাহাড়সম জমে থাকা সংকটগুলোর সমাধান সম্ভব নয়।

বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকা শহরের সবচেয়ে সমন্বয়হীন ও অবহেলিত খাত হচ্ছে জলাবদ্ধতা নিরসন। বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার পর ওয়াসার হাত থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনের মূল দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হাতে দেওয়ার পরও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। এই ফলাফল যে সত্যকে সামনে আনে সেটি হলো, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সবার আগে দরকার নদী, খালকে কেন্দ্রে রেখে পানিনিষ্কাশনের একটি বিজ্ঞানভিত্তিক রোডম্যাপ। বিচ্ছিন্ন ও সমন্বয়হীন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত আক্ষরিক অর্থেই জনগণের অর্থ পানিতে ফেলা ছাড়া আর কোনো ফল দেবে না।