রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুধর্ষণ ও হত্যার মামলায় আদালত চার কার্যদিবসে রায় ঘোষণা করেছেন। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় তদন্ত ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার পরিপ্রেক্ষিতে এটি নিঃসন্দেহে দ্রুত বিচারের একটি দৃষ্টান্ত। তবে দ্রুত বিচার যেন ন্যায়বিচারের পথে বাধা না হয়, তা নিয়ে সতর্কতা জরুরি।
শিশুটির ওপর যে সীমাহীন নিষ্ঠুরতা ঘটেছে, সেটি শুধু অপরাধের দিক থেকে ভয়াবহ নয়; আমাদের পুরো আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা ও আইনের শাসনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ রকম একটি ঘটনায় নাগরিকদের মধ্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রবল প্রত্যাশা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা মনে করি, সরকার, মামলার তদন্তকারী সংস্থা, আইনজীবী—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার ফলে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার রায় ঘোষণা করেছেন।
রায়ে আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে জরিমানা করা হয়। রায়ে ভুক্তভোগী পরিবার সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আমরা আশা করি, নিম্ন আদালতের এই রায় যৌক্তিক সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।’ তবে রূঢ় বাস্তবতা হলো, আমাদের পরিবার, সমাজ, সরকার, আইন ও বিচারব্যবস্থা শিশুদের সুরক্ষা দিতে অনেকটাই ব্যর্থ হচ্ছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণার ফলাফল হতাশাজনক বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছেন আসামিরা। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণেই বিচারহীনতার এই দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে।
পল্লবীর শিশুটির ওপর ঘটে যাওয়া সহিংসতা পুরো সমাজকেই স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ করে। এর আগে মাগুরার একটি শিশুধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার ক্ষেত্রেও দেশবাসীর মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভের জন্ম হয়েছিল। পল্লবীর ঘটনার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এবং মাগুরার ক্ষেত্রে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ভুক্তভোগীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসীয় উদ্যোগ।
আমরা মনে করি, শুধু আলোচিত ঘটনা নয়, সব ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর পাশে রাষ্ট্র ও সরকারকে দাঁড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নারী ও শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার মামলায় যে বিচারহীনতার বৃত্ত তৈরি হয়েছে, সেটা ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে।
বর্তমান সরকার বারবার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা মনে করি, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন যথার্থ বলেছেন, ‘সুশাসন চাইলে জনমত ও আবেগ দিয়ে আদালতকে প্রভাবিত করা যাবে না।’ এ ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগ থেকে যদি বিচারের কোনো প্রত্যাশা করা হয়, সেটাও ন্যায়বিচারে প্রভাব তৈরি করতে পারে। আসামিপক্ষকে যথাযথভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, সেটাও ন্যায়বিচারের বড় একটি শর্ত।
নারী ও শিশুদের প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কিন্তু এ ধরনের মামলায় সাজার হার এখনো অনেক কম। ফলে একটি–দুটি আলোচিত ঘটনায় জনমতের চাপে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাটাই সমাধান নয়। রাষ্ট্র ও সরকারকে অবশ্যই সব ভুক্তভোগীর জন্য সমানভাবে ন্যায়বিচারের সুযোগ তৈরি করতে হবে।