আতঙ্কের নাম ছিনতাই

নাগরিকের জানমাল রক্ষায় পদক্ষেপ কোথায়

ঢাকার ছিনতাই নাগরিক নিরাপত্তা ও উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ছিনতাইকারীদের হাতে নাগরিকেরা শুধু অর্থ, মুঠোফোনসহ মূল্যবান সম্পদ হারাচ্ছেন না; প্রাণহানি ও অঙ্গহানির মতো ঘটনাও নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ জানমালের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় হুমকি তৈরি করলেও পুলিশের নথিতে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। একদিকে শিথিল আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা, অন্যদিকে বিচারহীনতা ঢাকা ছিনতাইকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। 

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত ছয় মাসে ঢাকায় চলন্ত রিকশা ও অটোরিকশা থেকে ব্যাগ টান দেওয়ার ঘটনায় তিনজন নারী ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ২৯ আগস্ট ভোরে। বগুড়ার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রনজিলা পারভিন চোখের চিকিৎসা করাতে হাসপাতালে যাওয়ার পথে ঢাকার সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীরা ব্যাগ ধরে টান দিলে ছিটকে সড়কে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়। রনজিলা পারভিনের এমন আকস্মিক মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবার, সহকর্মী আর শিক্ষার্থীদের শোকার্ত করেনি; নাগরিকদের মধ্যে বেদনা ও ভয়ের অনুভূতি তৈরি করেছে। এর আগে জুন মাসে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে এবং পাঁচ মাস আগে উত্তরায় ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান আরও দুই নারী।

১ মার্চ থেকে ৩০ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত ২২টি আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা বিশ্লেষণ করে প্রথম আলো দেখেছে নাগরিকেরা ছিনতাইকারীদের হাতে কতটা ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে যে কুপিয়ে, ছুরিকাঘাত করে, গুলি করে, এমনকি চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, একসময় রাজধানীতে ভোর কিংবা রাতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটলেও সাম্প্রতিক কালে ছিনতাইয়ের ক্ষেত্রে দিন–রাতের কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা—কর্মব্যস্ত সময়েও হরহামেশাই নাগরিকেরা ছিনতাইকারীদের শিকার হচ্ছেন।

পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথিতে রাজধানীর তিন শতাধিক স্পটকে ছিনতাইপ্রবণ বলে চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবতা হচ্ছে ঘর থেকে বের হয়েও নাগরিকেরা ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন। এটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থার দুর্বলতা ও গাফিলতির লক্ষণ। পুলিশ যতই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলুক না কেন, নাগরিকদের সুস্পষ্ট অভিযোগ হলো, আগের তুলনায় তল্লাশিচৌকি অনেক কমে গেছে এবং অনেক জায়গায় তল্লাশিচৌকি থাকলেও বেশির ভাগ সময় পুলিশ থাকে না, থাকলেও তল্লাশিচৌকি ছেড়ে মুঠোফোনে তাঁরা ব্যস্ত থাকেন। এই অভিযোগ অবশ্যই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে খতিয়ে দেখতে হবে। কেননা, এটা কেবল গুরুতর অভিযোগই নয়; নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশের যে অঙ্গীকার, তারও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ঢাকায় নাগরিকেরা যখন অহরহ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন; প্রাণহানি, অঙ্গহানির মতো গুরুতর ঘটনা ঘটছে, তখন পুলিশের নথিতে ছিনতাইয়ের হিসাব না থাকাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমনিতেই নাগরিকেরা ছিনতাইয়ের শিকার হলে সাধারণত মামলা করেন না। ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে যাঁরা মামলা করতে যান, তাঁদের ঘটনাগুলোও যদি ‘সম্পদ হারানোর’ মামুলি ঘটনা হিসেবে সাধারণ ডায়েরি আকারে নথিভুক্ত হয়, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে? 

আমরা মনে করি, ছিনতাইয়ের ঘটনা ছিনতাই হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়াটা বিচারহীনতার পথ তৈরি করছে। একের পর এক ছিনতাই ও প্রাণহানি নাগরিকদের মধ্যে যে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করেছে, সেটা অবশ্যই সরকারকে নিরসন করতে হবে। ছিনতাই বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।