সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

জীবন রক্ষার অক্সিজেন

দরকারের সময় মানুষ কেন সেবা পাবে না

অক্সিজেন যে জীবন রক্ষার জন্য কতটা অত্যাবশ্যক, করোনা মহামারির অভিজ্ঞতা আমাদের সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে। সময়মতো অক্সিজেন দিতে না পারায় অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুর কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে দেখেছি। সে সময় জনস্বাস্থ্যবিদেরা বারবার করে আগামী মহামারি মোকাবিলার জন্য জনস্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য সতর্ক করেছিলেন। আমাদের চিকিৎসা খাত যে করোনার বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শিক্ষা নিতে পারেনি, সেটা ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি) মেডিকেল অক্সিজেনের প্রাপ্যতাবিষয়ক এক নীতি সংলাপে পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। দরকারের সময় ৭০ শতাংশ মানুষ অক্সিজেন না পাওয়ার তথ্যটি একই সঙ্গে চরম হতাশার ও উদ্বেগের।

মেডিকেল অক্সিজেনের বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট–এর গঠিত কমিশনের নির্বাহী সদস্য আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানুর রহমান নীতি সংলাপে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ল্যানসেট কমিশন রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে অক্সিজেন প্রয়োজন আছে, এমন ১০০ জনের মধ্যে ৪৬ জন নানা কারণে হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যান না, যেতে পারেন না। ৮ শতাংশ হাসপাতালে গিয়ে দেখেন সেগুলো সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। হাসপাতালে জনবল সমস্যাসহ নানা সমস্যা থাকার কারণে ৮ শতাংশ সেবা নিতে পারেন না। আবার ৮ শতাংশের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তাঁরা মানসম্পন্ন সেবা পান না। এখানে তীব্র সমস্যায় আক্রান্ত বা অস্ত্রোপচারের সময় মোট ৭০ শতাংশ মানুষ অক্সিজেন পান না।

বাংলাদেশে প্রতিদিন ১১০-১২০ টন মেডিক্যাল অক্সিজেন প্রয়োজন হলেও করোনা মহামারির সময় দৈনিক সর্বোচ্চ চাহিদা ৪০০ টনে পৌঁছে গিয়েছিল। সে সময় সরকার নিজস্ব অর্থায়ন এবং এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক ও জাতিসংঘের অর্থায়নে ৯৯টি মেডিক্যাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছিল। এর অনেকগুলো চালু হলেও নিম্নমানের জিনিসপত্র দিয়ে অক্সিজেন ব্যবস্থা গড়ে তোলায় অধিকাংশই আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

২০২৫ সালে আইসিডিডিআরবির গবেষকেরা বাংলাদেশের ১০১টি অক্সিজেন প্ল্যান্টের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে দেখতে পান ৩৪টি (৩৩.৭%) সচল বা কাজ করছে, ৪৭টি প্ল্যান্ট (৪৬.৫%) কাজ করে, কিন্তু মূল্যায়নের সময় চালু দেখা যায়নি। বাকি ২০টি (১৯.৮%) ব্যবহারের অনুপযোগী।

গত সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, চিকিৎসার সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এসব অবকাঠামো ও সরঞ্জামের অনেকগুলোই পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতকে এই দুর্নীতি ও অপচয়ের বৃত্ত থেকে বের করে আনা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো হাসপাতালেই যখন অস্ত্রোপচারের সময় অক্সিজেন পাওয়া যায় না কিংবা অক্সিজেন নিয়ে টানাটানি শুরু হয়, তাহলে দেশের অন্য হাসপাতালের পরিস্থিতি কতটা শোচনীয়, সেটা বলা বাহুল্য। বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থা অতিমাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় চিকিৎসার পেছনে রোগী ও স্বজনদের ব্যয় অনেক বেশি বেড়ে যায়। সবচেয়ে বড় কথা, অক্সিজেনের মতো জীবন রক্ষাকারী সেবা মানুষ কেন তার বাড়ির কাছের হাসপাতালে পাবে না।

দরকারের সময় অক্সিজেন দিতে দেরি করা মানে শুধু একটি চিকিৎসাসেবা দিতে ব্যর্থ হওয়া নয়; এর অর্থ একটি জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। তাই মেডিক্যাল অক্সিজেনকে স্বাস্থ্য অধিকার ও জীবন রক্ষার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে এখনই জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। মহামারির অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান বাস্তবতা—দুটিই আমাদের সামনে সতর্কবার্তা দিয়েছে। এবারও যদি আমাদের নীতিনির্ধারকেরা সেটা উপেক্ষা করেন, তার চরম মূল্য নাগরিকদেরই দিতে হবে।