সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

বাউফলে অবৈধ বালু তোলা

দোষীদের ধরুন, নদী বাঁচান

পটুয়াখালীর বাউফলের তেঁতুলিয়া নদীতে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও যে কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে, তা নিছক বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়—এটি প্রকাশ্য আইন অমান্যের একটি দৃষ্টান্ত।

দেখা যাচ্ছে, বাউফল পৌরসভা বিএনপির সভাপতি মো. হুমায়ুন কবিরের নির্দেশে প্রতিদিন খননযন্ত্র বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয় তদারককারীরা পর্যন্ত স্বীকার করছেন, প্রতি ঘনফুট বালুর জন্য নির্দিষ্ট হারে অর্থ তাঁর কাছে পৌঁছায়। এই অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন দেখা যায়, বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পরও উত্তোলন বন্ধ হয়নি।

এখানে কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে। প্রথমত, প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ইজারা স্থগিত রেখেছে। কারণ, নদীটি ভাঙনকবলিত। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ‘মৌখিক অনুমতির’ কথা বললেও উপজেলা প্রশাসন সরাসরি তা অস্বীকার করেছে। অর্থাৎ কোনো বৈধ অনুমতি ছাড়াই প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন চলছে। তৃতীয়ত, ইজারার মেয়াদ নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। এই তিন তথ্য একত্রে একটি সুসংগঠিত অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে।

এখানে দলীয় প্রভাবের প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। কারণ, প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে দিনের পর দিন খননযন্ত্র পরিচালনা করা কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়, যদি না তিনি রাজনৈতিক প্রভাবের বলয়ে নিজেকে সুরক্ষিত মনে করেন। আইন তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন তার প্রয়োগ ব্যক্তি ও পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। এ ঘটনায় সেই দুর্বলতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

পরিবেশগত ক্ষতির দিকটি এখানে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ভাঙনকবলিত নদীতে অব্যাহত বালু উত্তোলন নদীর তলদেশকে দুর্বল করে, স্রোতের গতিপথ বদলে দেয় এবং তীরভাঙনকে দ্রুততর করে। ফলে চরওয়াডেল, বাতির খাল, বড়ডালিমা ও ধানদী এলাকার বিস্তীর্ণ জমি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বহু বছর ধরে ভাঙনরোধের দাবিতে আন্দোলন করা মানুষের জন্য এটি সরাসরি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার প্রয়োগ নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান হয়। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও যদি প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন চলতে পারে, তবে তা কেবল একটি নদীর ক্ষয় নয়, এটি শাসনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষয়। প্রশ্নটি তাই শুধু তেঁতুলিয়া নদীকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর।