সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

স্থবির ‘কৃষক ছাউনি’ প্রকল্প

বজ্রপাত থেকে কৃষককে রক্ষায় উদাসীনতা কেন

জলবায়ু পরিবর্তনের এই বৈরী সময়ে দেশের বড় একটি দুর্যোগের নাম ‘বজ্রপাত’। বিশেষ করে চৈত্র-বৈশাখ ও বর্ষার মৌসুমে খোলা মাঠে কাজ করার সময় প্রতিবছর দেশের অসংখ্য কৃষকের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধু গাইবান্ধা জেলাতেই গত এক বছরে বজ্রপাতে ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন বহু মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে জেলাটির সুন্দরগঞ্জ উপজেলার একটি গ্রামে কৃষক ছাউনি আশাবাদী করে তোলে। তবে এমন স্থাপনা অন্যান্য বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে, সেটি হতাশাজনক।

জানা গেছে, ২০২০ সালে তৎকালীন এক কৃষি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দূরদর্শিতা ও উদ্যোগে শিবরাম গ্রামের ফাঁকা মাঠে মাত্র ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি গোলঘর বা ‘কৃষক ছাউনি’ নির্মাণ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—মাঠে কাজ করার সময় হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি বা বজ্রপাত শুরু হলে কৃষকেরা যেন দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারেন। বিগত ছয় বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই সামান্য ছাউনির কারণে ওই নির্দিষ্ট এলাকায় বজ্রপাতে আর একটি প্রাণও ঝরে যায়নি। কৃষকেরা এখন মেঘের ডাক শুনলে দিগ্‌বিদিক না ছুটে এই ছাউনিতে আশ্রয় নিচ্ছেন, প্রখর রোদে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, একটি সফল পরীক্ষামূলক (পাইলট) প্রকল্প হওয়ার পরও গত ছয় বছরে জেলাজুড়ে এই ছাউনির সংখ্যা আর একটিও বাড়েনি।

প্রশ্ন হলো, যা কৃষকের জীবন বাঁচাতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে, তা কেন আটকে থাকবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতোই চেনা অজুহাত হাজির করেছে—‘বরাদ্দের অভাব’। এমনকি স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্যের ৫০টি ছাউনি নির্মাণের বড়সড় প্রতিশ্রুতিও শেষ পর্যন্ত আর্থিক সংকটের অজুহাতে আলোর মুখ দেখেনি। যেখানে দেশে কোটি কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হচ্ছে, সেখানে মাত্র ৩৫-৪০ হাজার টাকার একটি জনকল্যাণমুখী ও জীবন রক্ষাকারী উদ্যোগ অর্থের অভাবে থমকে থাকবে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

বজ্রপাতকে ইতিমধ্যে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু শুধু দুর্যোগ ঘোষণা কিংবা তালগাছের চারা রোপণের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর ভরসা করে বসে থাকলে তো প্রতিদিন মাঠে কৃষকের লাশ পড়বে। তালগাছ বড় হতে যেখানে বছরের পর বছর সময় লাগবে, সেখানে কৃষক ছাউনির মতো তাৎক্ষণিক ও সাশ্রয়ী সমাধান কেন সারা দেশের হাওর, চর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের ফসলি মাঠগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না?

আমরা মনে করি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বরাদ্দের অজুহাত বন্ধ করে কৃষি বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশব্যাপী কৃষক ছাউনি নির্মাণের একটি সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।