সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

জাতীয় পরিচয়পত্র

হস্তান্তরের প্রয়োজন পড়ল কেন

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধনের কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেওয়ার উদ্যোগ চূড়ান্ত প্রায়। গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন আইন করার প্রস্তাব অনুমোদনের পর নিবন্ধনের ক্ষমতা আর নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকছে না। তারা কেবল ভোটার তালিকা তৈরি করতে পারবে।

২০২১ সালেও সরকার জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন কার্যক্রম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নেওয়ার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে সময় প্রস্তাবটি আর এগোয়নি নির্বাচন কমিশনের বিরোধিতার কারণে।

সেই সময়ের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা হস্তান্তরের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কোনোরূপ আলাপ-আলোচনা ছাড়াই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এটি কমিশনের হাতেই থাকা উচিত। তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছিলেন, এতে নির্বাচন কমিশনের অঙ্গহানি হবে।

ইসির বিরোধিতার কারণে সে যাত্রা সরকারের উদ্যোগটি স্থগিত থাকলেও এবার সরকার আইনটি পাস করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হয় যে এনআইডি দেওয়ার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের নয়। তাদের দায়িত্ব ভোটার তালিকা করা। তবে আমাদের দেশে এনআইডি করার পটভূমিটাও দেখতে হবে।

বিএনপি সরকারের আমলে ১ কোটি ২০ লাখ ভুয়া ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক ওঠার পর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়। এই প্রেক্ষাপটেই ২০০৭ সালে এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির সময় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করে। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইসির অধীনে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ একটি আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়। পরে স্মার্ট এনআইডিও ইসির ব্যবস্থাপনায় হয়।

মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেছেন, প্রস্তাবিত আইনের অধীনে নিবন্ধকের কার্যালয় থাকবে। এই অফিসের প্রধান হবেন নিবন্ধক। তঁার মাধ্যমে এ কাজটি হবে। এর একটি বৈশিষ্ট্য হলো যেকোনো নাগরিক জন্মের পরপরই নাগরিক সনদ বা একটি নম্বর পাবেন। এই নম্বর অপরিবর্তিত থাকবে। যখন একজন নাগরিক এই নম্বর পাবেন, তখন পরিচয়ের জন্য আর কোনো নম্বর লাগবে না।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে, এত বছর পর এনআইডি নিবন্ধন কার্যক্রম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তরের প্রয়োজন পড়ল কেন? নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত লোকবল তৈরি করেছে। তঁারাও কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন চলে যাবেন, না নতুন করে জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে? বলা হয়েছে, ভোটার তালিকার দায়িত্ব ইসির কাছেই থাকবে।

১৭ কোটি মানুষের এনআইডি নিবন্ধন বিরাট কর্মযজ্ঞ। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এনআইডির বিষয়টি চলে গেলে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও পরিধি খর্ব করা হবে। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা খর্ব করা নির্বাহী বিভাগের জন্য কতটা সমীচীন হবে, তা–ও ভেবে দেখার বিষয়।

বর্তমান নির্বাচন কমিশন ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব নাগরিকদের এনআইডি দিয়ে থাকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি জন্মের পর এনআইডি দেয় এবং ইসি ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব নাগরিকদের তালিকা তৈরি করে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দ্বৈতশাসন চালু হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সরকার এমন একসময়ে এনআইডি ইসির কাছ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, যখন নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি অবস্থানে। রাজনৈতিক মতৈক্য ছাড়া এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দুই পক্ষের মধ্যকার সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বাড়াবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।