শীত এলেই দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথ যেন এক নীরব মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়। ঘন কুয়াশা, ডুবোচর, নাব্যতা-সংকট আর সংকেতব্যবস্থার ভয়াবহ ঘাটতি মিলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা চরম ঝুঁকিতে। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, প্রতিদিন হাজারো যাত্রী ও বিপুল পরিমাণ পণ্য বহনকারী লঞ্চ ও জাহাজ চলাচল করছে নিরাপত্তার শর্ত পূরণ ছাড়াই।
পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, দক্ষিণাঞ্চলের ৩১টি নৌপথের মধ্যে ২২টিতে শীত মৌসুমে পানির গভীরতা কমে যাওয়ার তথ্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহু বছর ধরে অকার্যকর বয়া, মার্কার ও সংকেতবাতি। ফলে কুয়াশায় রাতের বেলা নৌযান চালানো অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে অন্ধকারে দিশা খোঁজার নামান্তর। সাম্প্রতিক সময়ে মেঘনা নদীতে একের পর এক লঞ্চ সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা সেই বাস্তবতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
এই সংকট নতুন নয়; ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ লঞ্চ দুর্ঘটনা আজও জাতির স্মৃতিতে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। ৪৭ জন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা ছিল না; তা ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল নজরদারি ও সমন্বয়হীন ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ পরিণতি। এরপরও পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হয়নি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
নৌপথ ব্যবহারকারীরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, রাতে চলাচলের জন্য যেসব এলাকায় বয়া ও সংকেতবাতি থাকার কথা, সেসব জায়গায় সেগুলো নেই বা অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক স্থানে ডুবন্ত বা নোঙর করা বাল্কহেড কুয়াশার মধ্যে অদৃশ্য ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক রাডার ও ইকোসাউন্ডার থাকা সত্ত্বেও ঘন কুয়াশায় দিকনির্ণয় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, বিশেষত ছোট ও পুরোনো লঞ্চগুলোর ক্ষেত্রে।
বিআইডব্লিউটিএ নিয়মিত ড্রেজিং, হাইড্রোলজিক্যাল জরিপ এবং সংকেতব্যবস্থা উন্নয়নের আশ্বাস দিলেও বাস্তব অগ্রগতি চোখে পড়ে না। ‘নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’—এই বাক্য বারবার শোনা যায়; কিন্তু নৌপথে ঝুঁকি কমে না। প্রশ্ন হলো, কত প্রাণ গেলে এই নির্দেশ বাস্তবে কার্যকর হবে?
নৌপথ নিরাপত্তা কোনো মৌসুমি ইস্যু নয়; এটি একটি সার্বক্ষণিক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। শীত আসার আগেই ড্রেজিং সম্পন্ন করা, বয়া ও সংকেতবাতি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, রাতের বেলায় বাল্কহেড চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার বিস্তার—এই পদক্ষেপগুলো আর বিলম্বিত করা চলে না। আমরা আশা করি, দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি ঠেকাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেবে কর্তৃপক্ষ। কেবল আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত ড্রেজিং সম্পন্ন করবে, কার্যকর বয়া, মার্কার ও সংকেতবাতি স্থাপন করবে এবং রাতের নৌচলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে।