সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

এল নিনোর নতুন ঝুঁকি

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও সতর্কতা জরুরি

প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে তাপপ্রবাহ ও অতিরিক্ত বৃষ্টির মতো চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এল নিনো নামে পরিচিত বৈশ্বিক আবহাওয়ার এই প্রবণতা স্বাভাবিক হলেও এবার এর তীব্রতা অনেকটাই বেশি। সে কারণে বিজ্ঞানীরা এটিকে ‘সুপার এল নিনো’ বলছেন। গত ১১ জুন ঘটা করে এর আগমন হয়েছে এবং কমবেশি প্রভাব থাকবে ১২ থেকে ১৮ মাস। এল নিনো এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রধান একটি সংবাদ হয়ে উঠেছে। জুন-জুলাই মাসের তাপপ্রবাহে ইউরোপে অতিরিক্ত ১০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) তাদের বিবৃতিতে এল নিনোর প্রভাব নিয়ে যে সতর্কবার্তা দিয়েছে, তাতে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। আইআরসি বলেছে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় আবহাওয়ার বৈরিতা আরও বাড়তে পারে। এ কারণে বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি অব্যাহত থাকার পাশাপাশি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এল নিনোর বিপরীতমুখী প্রবণতা হলো অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি। এ ধরনের আবহাওয়া সাময়িক স্বস্তি এনে দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এ ধরনের অস্বাভাবিক আবহাওয়া কত বড় দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সাম্প্রতিক টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ধস ও বন্যা তার প্রমাণ দেয়। আইআরসিও সতর্ক করেছে, এল নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে আগামী কয়েক সপ্তাহে বন্যা, ভূমিধস ও সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব হতে পারে।

বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি মৌসুমি বায়ু ও বৃষ্টির ওপর এখনো অনেকখানি নির্ভরশীল। ফলে এল নিনোর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে এ দুটি খাতেই। সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেলাগুলোসহ দেশের প্রায় ৪৩টি জেলা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোট এক লাখ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বন্যায় আমন ধানের উৎপাদন ৩ শতাংশ কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদেরা। এ ছাড়া সবজির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার প্রভাব পড়েছে বাজারে। শুধু কৃষি নয়, এই বন্যা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ক্ষতি করেছে।

এল নিনোর প্রভাবে অতি ভারী বৃষ্টির শঙ্কা থাকায় আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ রকম আকস্মিক বন্যা হতে পারে। এতে কৃষির পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন করে মূল্যস্ফীতিও উসকে দিতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতার বড়সড় ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু এই সীমিত সক্ষমতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাজে লাগানো যায় না। তার মূল কারণ হলো আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিরোধমূলক নয়; বরং প্রতিক্রিয়ামূলক। এর অর্থ কোনো দুর্যোগ দেখা দিলেই কেবল আমরা সক্রিয় হয়ে উঠি। এই নীতিগত দুর্বলতা নাগরিকের জানমালের জন্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, সাম্প্রতিক পাহাড়ধস ও প্রাণহানির ঘটনাগুলো তার প্রমাণ দেয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সতর্কবার্তা আগে থেকে জানা সত্ত্বেও কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আমরা মনে করি, এল নিনো নিয়ে আইআরসির সতর্কবার্তা সরকারের জন্য আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়ার বার্তা। অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ ও খরার মতো চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার কারণে সম্ভাব্য দুর্যোগ ও সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকারকে অবশ্যই একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকদের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতি রক্ষায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।