সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

হাতপাখায় দারিদ্র্য জয়

পীরগাছার নারীদের স্বনির্ভরতার অনন্য নজির

উন্নয়নবৈষম্যের কারণে রংপুর অঞ্চলের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি কারও অজানা নয়। তবে সেখানকার মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যকে জয় করতে যে প্রচেষ্টা দেখা যায়, তা অভাবনীয়। পীরগাছা উপজেলার পাঁচটি গ্রামের নারীরা এ ক্ষেত্রে অনুসরণীয় হতে পারেন। প্রযুক্তির জয়জয়কার আর বৈদ্যুতিক পাখার ভিড়ে বিলুপ্তপ্রায় ‘হাতপাখা’ যে ১ হাজার ৫০০ নারীর ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে, সেটি প্রমাণ করেছেন তাঁরা।

প্রথম আলো জনাচ্ছে, হাড়িয়াপাড়া, কামদেব, কালীগঞ্জ, আটানী ও কালিয়াপাড়া—পীরগাছার এসব গ্রামের নারীদের সাফল্যের পেছনে রয়েছে স্থানীয় উদ্ভাবন ও কঠোর পরিশ্রম। পোশাক কারখানার পরিত্যক্ত রঙিন সুতা আর বাঁশের বাতা ব্যবহার করে যে শৈল্পিক পাখা তৈরি হচ্ছে, তা কেবল গ্রীষ্মের দহনই জুড়াচ্ছে না, গ্রামগুলোর অন্তত ৮০০ পরিবারের কপালও খুলে দিয়েছে। একসময়কার ভূমিহীন বা অতিদরিদ্র নারীরা আজ পাখা তৈরির আয়ে জমি কিনছেন, গাভি-ছাগল পালন করছেন, এমনকি নিজস্ব পুকুর খনন করে মাছ চাষও করছেন। মাসে ১২ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করার এই সক্ষমতা গ্রামীণ অর্থনীতির ভিতকে যে কতটা মজবুত করতে পারে, পীরগাছার নারীরা তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

গৃহকর্মের ফাঁকে ফাঁকে বা বিশ্রামের অবসরে দল বেঁধে পাখা তৈরির এই প্রক্রিয়া এখন একটি কুটিরশিল্পে রূপ নিয়েছে। ৩০ বছর আগে আমেনা ও দুলালী বেগমের হাত ধরে যে উদ্যোগের শুরু, আজ তা দেড় হাজার নারীর জীবনে বসন্তের হাওয়া নিয়ে এসেছে। অভাব-অনটনের জাঁতাকলে পিষ্ট স্বামীহারা রশিদা বা ভূমিহীন মঞ্জিলা খাতুনদের এই ঘুরে দাঁড়ানো আমাদের শেখায় যে যথাযথ কর্মসংস্থান আর সদিচ্ছা থাকলে কোনো বাধাই অজেয় নয়।

তবে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হতে পারে, যদি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বর্তমানে খামারিরা নিজস্ব উদ্যোগে দূরদূরান্ত থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করছেন এবং পাইকারদের কাছে পণ্য বিক্রি করছেন। যদি তাঁদের সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করা হয় এবং বিপণনব্যবস্থায় সরাসরি বাজারের সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া যায়, তবে লাভের অঙ্ক আরও বাড়বে। উপজেলা সমাজসেবা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের নজরদারির পাশাপাশি এই ‘পাখাশিল্প’কে যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তবে পীরগাছা মডেল সারা দেশের দুস্থ নারীদের জন্য একটি পথপ্রদর্শক হতে পারে।

পীরগাছার নারীরা প্রমাণ করেছেন যে বড় কোনো কলকারখানা নয়, হাতের নৈপুণ্য আর সামান্য মূলধন দিয়েই দারিদ্র্যের শিকল ভাঙা সম্ভব। তাঁদের প্রতি আমাদের অভিবাদন।