সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

সমন্বিত ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ প্রয়োজন

দূষিত বায়ুর সীমান্ত পারাপার

বায়ুদূষণ-সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তা যেমন উদ্বেগের, তেমনি কৌতূহলেরও। বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। বায়ুদূষণের দিক থেকে বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকা ও ভারতের রাজধানী শহর দিল্লির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ করা যায়। মাঝেমধ্যে দিল্লিকে হারিয়ে ঢাকা চ্যাম্পিয়ন হয়। 

গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘বায়ুদূষণমুক্ত করার প্রচেষ্টা: দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুদূষণ ও জনস্বাস্থ্য’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় বায়ুদূষণের উৎস প্রায় ৪ শতাংশ প্রাকৃতিক ও ৬ শতাংশ অভ্যন্তরীণ। প্রায় ২৮ শতাংশ দূষণের উৎস সীমান্তের ওপার থেকে আসা দূষিত বায়ু। দেশের অন্য বিভাগ ও জেলা থেকে আসা দূষিত বায়ুও রাজধানীর বাতাসকে দূষিত করছে। ঢাকার বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে অন্য বিভাগ ও জেলার দূষিত বায়ুর ভূমিকা ৬০ শতাংশের কিছু বেশি। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার বায়ুদূষণে ৩০ শতাংশ ভূমিকা রাখে সীমান্তের ওপার থেকে আসা দূষিত বায়ু। আবার বাংলাদেশ থেকেও দূষিত বায়ু ভারতে যায়।  

বলা হয়, বায়ু ও পাখি সীমান্ত মানে না। এক দেশের পাখি অন্য দেশের তেমন ক্ষতি করে না। কিন্তু দূষিত বায়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে। এর আগে এই সংস্থার ‘ব্রিদিং হেভি: বায়ুদূষণের নতুন তথ্য-প্রমাণ এবং স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের বায়ুদূষণপ্রবণ এলাকায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় বায়ুদূষণ বেশি, সেখানের মানুষ বেশি মাত্রায় বিষণ্নতায় ভুগছে। ২০১৯ সালে দেশে বায়ুদূষণে সর্বোচ্চ ৮৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। দূষণপ্রবণ এলাকাগুলোর প্রায় ১৪ শতাংশ বাসিন্দা বিষণ্নতায় ভুগছে। দেশে বায়ুদূষণে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। এরপরই অবস্থান বরিশাল বিভাগের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত মাত্রা থেকে ১ শতাংশ দূষণ বাড়লে বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা ২০ গুণ বেড়ে যায়।

দেশের ভেতরে বায়ুদূষণের দিক দিয়ে প্রথমে আছে ঢাকা। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি দূষিত বায়ু বরিশাল বিভাগে। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে বায়ুদূষণ অপেক্ষাকৃত কম। দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে তিনটি উপাদানকে চিহ্নিত করা হয়েছে—যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা ও শুষ্ক মৌসুমে অবকাঠামো নির্মাণ। মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়কে চললে ধোঁয়ার মাত্রাও বেড়ে যায়।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও বায়ুর মানবিষয়ক গবেষক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের যে অঞ্চলগুলোতে সবচেয়ে বেশি দূষিত বায়ু সৃষ্টি হয়, তার মধ্যে ইন্দো-গাঙ্গেয় অঞ্চলের দেশগুলো রয়েছে। এ অঞ্চলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বেশি। দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ ও নগরায়ণের কারণেও ধুলা বাড়ছে। এ ছাড়া এ অঞ্চলের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখন অনেক বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি দিয়ে রান্না করে ও শীতকালে উষ্ণতা নেয়।

জীবনধারণের জন্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আমাদের নজর রাখতে হবে, কতটা কম দূষণ করে এই জ্বালানি পাওয়া যায়। দূষণের কারণে অনেক উন্নত দেশ কয়লাভিত্তিক জ্বালানি বন্ধ করে দিয়েছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু আমাদের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে; যদিও নবায়নযোগ্য জ্বালানিও কিছু কিছু ব্যবহার করা হচ্ছে।  

বায়ুদূষণ রোধের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়ম রক্ষার অভিযান চালানো ছাড়া সংস্থাটির কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান নয়। পরিবেশের বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। এ জন্য বায়ুদূষণ রোধে আলাদা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, আন্তরাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সর্বাত্মক ও সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া বায়ুদূষণ রোধ করা সম্ভব নয়।