সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

টিসিবির লাইনে বেদনার কাব্য

শৃঙ্খলা ও আওতা বাড়ানো প্রয়োজন

উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) ট্রাক সেল কেবল একটি সরকারি কর্মসূচি নয়; বরং টিকে থাকার অবলম্বন। মিরপুরের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাতিকে শিকলে বেঁধে টিসিবির ট্রাক সেলের লাইনে দাঁড়ানো সালেহা বেগমের গল্প আসলে বাংলাদেশের লাখো দরিদ্র মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। কয়েক শ টাকা সাশ্রয়ের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে অপেক্ষা করা, এমনকি ট্রাকের পেছনে দৌড়ানো—এসব দৃশ্য শুধু দারিদ্র্যের নয়, রাষ্ট্রীয় সহায়তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও প্রতীক।

টিসিবির ট্রাক সেল কার্যক্রম নিঃসন্দেহে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বস্তির উদ্যোগ। বাজারে যেখানে দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি মসুর ডাল ও এক কেজি চিনি কিনতে প্রায় ৬৭৫ টাকা লাগে, সেখানে টিসিবি একই প্যাকেজ দিচ্ছে ৪৮০ টাকায়; অর্থাৎ একজন মানুষ প্রায় ২০০ টাকা সাশ্রয় করতে পারছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সহায়তা কি মর্যাদার সঙ্গে পৌঁছাচ্ছে?

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, মঙ্গলবার আগারগাঁওয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী দেরিতে আসার কারণে বৃদ্ধ মানুষদের আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। অন্যদিকে মিরপুরে ট্রাক সময়মতো না আসায় শত শত মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে থেকেও অনিশ্চয়তায় ভুগেছেন। পরে ট্রাক এলে হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর প্রতিবেদনে পণ্য পেতে চলন্ত ট্রাকে ঝুলে পড়া মানুষের চিত্র উঠে এসেছে। টিসিবির লাইনে এসব দৃশ্য যেন বেদনার কাব্য রচনা করে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা কোনো দয়া নয়, নাগরিক অধিকার—এই উপলব্ধি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

দেশে তিন বছরের বেশি সময় ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে, তার কারণে বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। এর ফলে প্রায় সব ধরনের পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে। টিসিবির ট্রাকের লাইনে মানুষের দীর্ঘ লাইন ও পণ্য পেতে হুড়োহুড়ির ঘটনা বলে দেয়, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপনের সংকট কতটা তীব্র হয়েছে। আমরা মনে করি, টিসিবির ট্রাকের সংখ্যা যেমন বাড়ানো প্রয়োজন, তেমনিভাবে বাড়াতে হবে পণ্যের সংখ্যাও।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিসিবির পণ্য বিক্রিতে শৃঙ্খলা ও মানবিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ট্রাক কোথায় ও কখন যাবে, তা আগেভাগে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। প্রবীণ, নারী, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখতে হবে। ট্রাকের অবস্থান পরিবর্তন হলে যেন বিশৃঙ্খলা না হয়, সে জন্য পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন জরুরি। পাশাপাশি একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য কেনা ঠেকাতে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক যাচাইয়ের ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে।

টিসিবির কার্যক্রমের বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এর অস্থায়ী চরিত্র। ঈদ বা রমজানকেন্দ্রিক বিশেষ উদ্যোগ কিছুটা স্বস্তি দিলেও বাজারের স্থায়ী অস্থিরতায় নিম্ন আয়ের মানুষ সারা বছরই চাপে থাকেন। তাই শুধু উৎসবকেন্দ্রিক ট্রাক সেল নয়; বরং নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহের একটি স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও বাজার তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা না হলে টিসিবির কার্যক্রমও শেষ পর্যন্ত সাময়িক উপশম হয়েই থাকবে।