সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরি

মামলা নিতে এমন গড়িমসি কেন

ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনে মোটরসাইকেল এখন শুধু একটি বাহন নয়, এটি বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। প্রথম আলোর খবরে এসেছে, গত ১৩ মাসে রাজধানী ঢাকা থেকে চুরি হয়েছে ১১৩টি মোটরসাইকেল।

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, তুরাগ এলাকায় এক ব্যবসায়ীর মোটরসাইকেল চুরির পর থানায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগ কিংবা উত্তরা পশ্চিম এলাকায় জিপিএস ট্র্যাকার থাকা সত্ত্বেও চুরি হওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধার না হওয়া, এসব ঘটনা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, নাগরিক আস্থার অবক্ষয়ের প্রতিফলন। একজন ভুক্তভোগী যখন থানায় গিয়ে ন্যূনতম আইনি সহায়তাও পান না, তখন আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি তাঁর আস্থা কোথায় দাঁড়ায়, সেটি সহজেই অনুমেয়।

পুলিশের পরিসংখ্যান একটি সীমিত বাস্তবতা তুলে ধরে। গত ১৩ মাসে মোটরসাইকেল চুরির ১১৩টি মামলা এবং প্রায় ৪০০টি যানবাহন চুরির মামলা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন, সব ঘটনায় মামলা হয় না; অর্থাৎ প্রকৃত চিত্র আরও উদ্বেগজনক। অপরাধের একটি বড় অংশ যখন নথিভুক্তই হয় না, তখন তা দমনের কৌশল কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সংঘবদ্ধ চক্রের সক্রিয়তা। একাধিক চক্র বছরের পর বছর ধরে সংগঠিতভাবে মোটরসাইকেল চুরি করে যাচ্ছে। তাদের রয়েছে সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, জেলা থেকে জেলান্তরে বিস্তৃত সংযোগ, এমনকি চুরি করা যানবাহনের ইঞ্জিন ও চেচিস নম্বর পরিবর্তনের মতো প্রযুক্তিগত দক্ষতাও। এটি নিছক চুরি নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অপরাধ অর্থনীতি, যা দুর্বল নজরদারি ও আইনি শিথিলতার সুযোগ নিয়ে বিস্তার লাভ করছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব শুধু অপরাধের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা। থানায় মামলা গ্রহণে গড়িমসি বা অনীহা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত তদন্ত শুরু করা জরুরি। একই সঙ্গে চোরাই যানবাহনের বাজার ও নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে তা ভেঙে ফেলার জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন।

প্রযুক্তির ব্যবহারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। জিপিএস ট্র্যাকিং, সিসিটিভি বিশ্লেষণ এবং ডেটাবেজ সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা সম্ভব। কিন্তু প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন তা ব্যবহারের সদিচ্ছা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।

মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাগুলোকে ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নাগরিক নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং নগরের শৃঙ্খলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে নাগরিকেরা অন্তত এ বিশ্বাস রাখতে পারেন যে তাঁদের সম্পদ ও অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র সচেষ্ট।