ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ প্রচার লক্ষ করা যাচ্ছে, সেটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বলেই আমরা মনে করি। প্রথম তিন দিনের প্রচারে বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ ছাড়া বড় কোনো সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের ঘটনা দেখা যায়নি। রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রার্থীরা মিছিল, সমাবেশ, দুয়ারে দুয়ারে প্রচার এবং ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তাপ ছড়ালেও বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নির্বাচনী প্রচারে এমন বাগ্যুদ্ধ স্বাভাবিক। তবে রাজনৈতিক বাগ্যুদ্ধ যাতে কোনোভাবেই সীমা অতিক্রম না করে কিংবা সহিংসতায় রূপ না নিতে পারে, সেদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি), অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল—সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
ভোটারদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং তাঁদেরকে অনুদান, উপহার দেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতি আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। তবে প্রচার শুরুর প্রথম দিন থেকেই কিছু ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা দেখা গেছে। এবার প্রচারে পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও অনেক প্রার্থীই সেটা মানছেন না। কিছু জায়গায় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অপচনশীল দ্রব্য, যেমন র্যাক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক ব্যবহার করে ব্যানার, ফেস্টুন টানাতে দেখা গেছে। এ ছাড়া মাইকে প্রচারের সময় নির্ধারিত সময়সীমা ও সহনীয় শব্দের মাত্রা প্রার্থীরা মানছেন কি না, এ নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। দু-একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা ও প্রচারে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
প্রার্থীরা যাতে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলতে বাধ্য হন, সে জন্য শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশনের কঠোর হওয়া প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত নিজেদের কঠোরতা দেখাতে পারেনি। ইসিকে মনে রাখা প্রয়োজন যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতির জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এসেছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান সাফল্য দেখা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে নির্বাচনের পরিবেশ কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না করতে পারে, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। সংবাদমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে অপতথ্য ও গুজব ছড়ানো হলেও, এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসির উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।
আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় অর্থ, ক্ষমতা ও পেশিশক্তি যে কতটা নির্ণায়কের ভূমিকায় চলে এসেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থীর মধ্যে কোটিপতি প্রার্থী ৮৯১ জন, শতকোটিপতি ২৭ জন। প্রতি চারজনের মধ্যে একজন প্রার্থীর ঋণ বা দায় রয়েছে। রাজনীতিকে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের করে আনতে হলে সুষ্ঠু ও কার্যকর গণতান্ত্রিক চর্চা জরুরি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দেশকে একতরফা ও কারসাজির নির্বাচন থেকে বের করে আনার বড় একটা সুযোগ। রাজনৈতিক দলগুলো এবং প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে কতটা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর প্রচারের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারছেন, তার ওপর ভোটার উপস্থিতি ও নির্বাচনী ফলাফল নির্ভর করবে। আমরা আশা করি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, আচরণবিধি ও আইন মেনে চলবেন। নির্বাচনী প্রচারের যে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর সূচনা হয়েছে, সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে।