সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

অনলাইনে পাঠদানের উদ্যোগ

শিক্ষার্থীরা যেন শিখনঘাটতিতে না পড়ে

মহানগর এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় বাদে বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনলাইন ও সশরীর মিলিয়ে মিশ্র ক্লাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সাশ্রয়ের কার্যকর পথ খুঁজে বের করাটা সরকারের জন্য জরুরি। তবে করোনা মহামারিকালে দীর্ঘদিন ক্লাস বন্ধ থাকা ও অনলাইন ক্লাসের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। সরকারকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষাবিদদের পরামর্শ ও অভিভাবকদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতবিনিময় সভায় সপ্তাহে তিন দিন অনলাইনে ও তিন দিন সশরীর ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে বা মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম বড় পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় অভাবনীয় এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম শুধু বাড়েইনি, বিকল্প উৎস থেকে এর প্রাপ্যতাও কঠিন ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বৈশ্বিক এই পরিস্থিতির অভিঘাত বাংলাদেশেও এসে পড়েছে। যুদ্ধের এক মাস পর এসেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ও মজুতে বড় সমস্যা তৈরি না হলেও মজুতদারি ও আতঙ্কের কেনাকাটার কারণে সংকট দেখা দিয়েছে। পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বাজারে পর্যাপ্ত তেল না মেলায় বোরোর সেচ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

সরকার মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে, তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সংকট প্রকট হবে বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। সে ক্ষেত্রে কৌশলগত পণ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও কৌশলপত্র তৈরি করা সবার আগে প্রয়োজন। জ্বালানি সংগ্রহে বিঘ্ন তৈরি হলে অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসাসহ জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। বিচ্ছিন্নভাবে স্কুল-কলেজে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালু করা হলে তাতে কতটা জ্বালানি সাশ্রয় হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়। সবচেয়ে বড় বিষয় এই সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে শিখনঘাটতি তৈরি হবে কি না, সে বিষয়ে শিক্ষাবিদদের পরামর্শও নেওয়া প্রয়োজন।

করোনা মহামারির সময় বিশ্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি দিন বন্ধ রাখা দেশের একটি বাংলাদেশ। সে সময় অনলাইন ও টেলিভিশনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হলেও সেটা ফলপ্রসূ হয়নি। বরং একটা প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ওপর এর অভিঘাত পড়েছে মারাত্মক। শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে গ্রাম, মফস্‌সল ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ব্যাপক শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে মুঠোফোন আসক্তিও তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে।

এটা প্রমাণিত যে বাংলাদেশের যে শিক্ষাকাঠামো ও শিক্ষাক্রম, সেখানে সশরীর ক্লাসের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। জ্বালানিসংকট তৈরি হলে অগ্রাধিকার পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে শিক্ষা থাকাটা বাঞ্ছনীয়।