সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

হাতি চলার পথে পাকা সড়ক

পরিবেশবিধ্বংসী উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে

উন্নয়নের নামে দেশের প্রাকৃতিক বনভূমি ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের কার্যক্রম থেমে নেই। কক্সবাজারের চকরিয়ার ঐতিহ্যবাহী মধুশিয়া গর্জনবনের মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক নির্মাণের কাজ প্রায় অর্ধেক শেষ করে এনেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। উদ্বেগজনক হলো, বন বিভাগের কোনো ধরনের অনুমতি বা অনাপত্তিপত্র (এনওসি) ছাড়াই সংরক্ষিত বনটির ভেতর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মাঝপথে এসে অনাপত্তির জন্য আবেদন করা হয়েছে, যা আইনের প্রতি চরম বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল।

মধুশিয়া গর্জনবনটি কেবল প্রাচীন বৃক্ষেরই আধার নয়, এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হাতি চলাচলের করিডর’। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে উখিয়া-ঘুমধুম এবং অপরিকল্পিত রেলপথ নির্মাণের ফলে চুনতিসহ কক্সবাজার অঞ্চলের একাধিক হাতির করিডর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় মধুশিয়া বনের বুক চিরে যদি পাকা সড়ক তৈরি হয়, তবে এশীয় হাতির আবাসের শেষ আশ্রয়টুকুও হারিয়ে যাবে। ফলে মানুষ ও হাতির সংঘাত যে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। বনের ভেতর দিয়ে সড়ক যাওয়া মানেই পরবর্তী সময়ে সেখানে বিদ্যুৎ যাওয়া, মানববসতি গড়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত বনের ফুসফুসকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।

একইভাবে পরিবেশের ওপর আরেকটি বড় আঘাতের ছক কাটা হচ্ছে মহেশখালীর সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। সেখানকার একজন সংসদ সদস্য বনের ভেতর দিয়ে একসঙ্গে ৩০টি সড়ক নির্মাণের জন্য ডিও লেটার দিয়েছেন, যার অনেকগুলোর নাকি টেন্ডারও হয়ে গেছে! মায়া হরিণ, বানর, হনুমান ও পাহাড়ি কচ্ছপের আবাসস্থল এই অনন্য বন ধ্বংস করে সড়ক বানানোর পক্ষে তাঁর যুক্তি, ‘সড়ক না করলে মালামাল যাবে কোন দিক দিয়ে?’ একজন জনপ্রতিনিধির মুখ থেকে এমন পরিবেশবিদ্বেষী ও দায়িত্বহীন বক্তব্য কোনোভাবেই আশা করা যায় না।

অথচ দেশের প্রচলিত আইন ও নীতি এসব কর্মকাণ্ডের সম্পূর্ণ বিরোধী। নবনির্ধারিত ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন-২০২৬’ এবং ‘জাতীয় বননীতি ২০২৫’ অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদের সম্মতি ও সরকারপ্রধানের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রাকৃতিক বন বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদেও জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে রাষ্ট্রের ওপর স্পষ্ট দায়বদ্ধতা দেওয়া হয়েছে। যেখানে খোদ সরকারপ্রধান দেশের পরিবেশ রক্ষায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন, সেখানে সরকারেরই একটি বিভাগ (এলজিইডি) এবং একজন সংসদ সদস্য কীভাবে দেশের আইনকে তোয়াক্কা না করে সংরক্ষিত বন ধ্বংসের আয়োজন করছেন? 

মধুশিয়া গর্জনবন বাঁচানোর দাবিতে চট্টগ্রামের নাগরিক সমাজ ও পরিবেশকর্মীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। বনের মাঝ দিয়ে এসব অপরিকল্পিত ও পরিবেশবিধ্বংসী অপ–উন্নয়ন থামাতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।