সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

নতুন রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা

জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে হবে

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আমরা তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই। জাতীয় সংসদে গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৩৪৩ জন ভোটারের মধ্যে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন এবং পরদিন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। প্রায় ৩৫ বছর পর একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হওয়া এ নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হলেন। ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ ও মন্ত্রিসভা—বিভিন্ন পরিসরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। দীর্ঘদিন তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশের রাজনীতির নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে দলটির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নতুন দায়িত্বের প্রকৃতি তাঁর পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিচয় থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন। একজন রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল দলীয় আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানকে এগিয়ে নেওয়া। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব হবে রাষ্ট্র, সংবিধান এবং সমগ্র জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা। এই রূপান্তর শুধু পদ পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি মানসিকতা, ভূমিকা ও দায়িত্বেরও পরিবর্তন।

রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম তাঁর নামেই পরিচালিত হয়। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হতে পারে, কিন্তু তাঁর সাংবিধানিক ও নৈতিক গুরুত্বকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত একটি সমাজে রাষ্ট্রপতির পদ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

সেই কারণেই নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। তিনি বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন—এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর পরিচয় আর কোনো দলের নয়; তিনি সমগ্র প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি। সরকার, বিরোধী দল এবং সংসদের বাইরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি—সবাই যেন তাঁর মধ্যে নিরপেক্ষতা দেখতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত তাঁর দায়িত্ব পালনের প্রধান মানদণ্ড।

রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন এবং রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে তাঁর অবস্থান ও ভূমিকার মধ্য দিয়েই সেই নিরপেক্ষতার পরীক্ষা হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন আস্থার সংকট গভীর এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, তখন রাষ্ট্রপতির আচরণ ও সিদ্ধান্তের প্রতি জনসাধারণের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকবে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে তাঁর জন্য সহায়ক হতে পারে। তিনি দেশের রাজনৈতিক সংঘাত, গণতান্ত্রিক সংকট এবং সাংবিধানিক বিতর্কের বিভিন্ন পর্যায় প্রত্যক্ষ করেছেন।

রাষ্ট্রপতি মূলত রাষ্ট্রের অভিভাবক। অভিভাবকের দায়িত্ব কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা নয়; বরং সবার অধিকার, মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রতি সমান দায়িত্বশীল থাকা। তাঁর দরজা ও মনোযোগ সব রাজনৈতিক মত, সামাজিক গোষ্ঠী এবং নাগরিকের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে—এমন আস্থা প্রতিষ্ঠা করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমন এক সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক বিভাজন কমানো অত্যন্ত জরুরি। তাঁর সামনে তাই সুযোগও আছে, চ্যালেঞ্জও আছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে একজন সত্যিকার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি তাঁর দায়িত্ব পালনে সফল হবেন—এমনটাই প্রত্যাশা করি। নতুন রাষ্ট্রপতিকে আমরা আবারও শুভেচ্ছা জানাই।