সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ভবদহের জলাবদ্ধতা

স্থায়ী সমাধান দরকার, ব্যবস্থা নিন

যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সমস্যাটি চলতে থাকলেও এর স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এবার জুলাই মাসের অব্যাহত বৃষ্টিতে অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার অন্তত ১০০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তিন মাস ধরে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু সড়কে আশ্রয় নিয়েছে। কোথাও ঘরের ভেতর পানি, কোথাও উঠানে হাঁটুপানি। ঘরের মধ্যে মাচা তৈরি করে বসবাস করতে হচ্ছে। গবাদিপশু ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সড়কের ওপর মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন অনেকে। অথচ এ পরিস্থিতি যেন কর্তৃপক্ষের কাছে নতুন কোনো ঘটনা নয়।

ভবদহের জলাবদ্ধতার প্রধান কারণও অজানা নয়। পলি জমে মুক্তেশ্বরী, শ্রী, হরি ও টেকা নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানিনিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হওয়ার কথা থাকলেও নদীগুলোর নাব্যতা না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এটি নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা ও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ব্যর্থতারও ফল।

অবশ্য সরকার নদী পুনঃখননে উদ্যোগ নিয়েছে। ১৩৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৯ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার কাজ শেষ হয়েছে। আরও ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪টি খালের ৭৮ দশমিক ২৩০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি মানুষের ঘরবাড়িতে পানি থেকে যায়, তাহলে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। শুধু খনন করলেই হবে না; নদীর পানিপ্রবাহ, জোয়ার-ভাটা এবং বিলের সঙ্গে নদীর সংযোগ—পুরো জলব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি, ভবদহে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা টিআরএম ব্যবস্থা চালু করা। জোয়ারের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কাজে লাগিয়ে পলি অপসারণ ও নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারে এ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। নদী খননের পাশাপাশি কোথায় টিআরএম প্রয়োজন, কোথায় জলাধার ও বিল ব্যবস্থাপনা করতে হবে, তার বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভবদহকে আর প্রতিবছরের বন্যা ও জলাবদ্ধতার খবর হিসেবে দেখা যাবে না। লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি রক্ষায় সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রকল্প গ্রহণ করে অর্থ ব্যয় করাই দায়িত্বের শেষ নয়; সেই প্রকল্পে মানুষের দুর্ভোগ কমছে কি না, তারও নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। ভবদহের মানুষ ত্রাণ নয়, স্থায়ী সমাধান চান। কর্তৃপক্ষের এখন সেই দায় স্বীকার করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।