প্রতিবছর রমজান মাস এলেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে, এ যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। এটা সত্যি যে রমজানে ছোলা, বেগুন, লেবুসহ কিছু পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে কিছুটা দাম বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে লেবুর হালি ২০০ টাকায় ওঠাটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি নয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, যেসব পণ্যের মজুত ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে, সেগুলোর দামও বেড়েছে।
বাজার তদারকির দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটই প্রতিবছর বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এমনিতেই দেশের বিরাটসংখ্যক নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী নানা রকম কায়দা করে জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দাম আরেক দফা বাড়া মানে তাঁদের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হওয়া।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুসারে, এবার লম্বা বেগুনের দাম রমজানের আগের দিন থেকে ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শসা ও ক্ষীরার দাম ৬০-৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০-১০০ টাকায়, আর টমেটোর দাম ৫০-৬০ টাকায় পৌঁছেছে। লেবু, পেঁয়াজ ও মুরগির দামও রমজান শুরুর দিন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে পরে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। রোজার শুরুতেই মাছ ও মাংসের দাম এক দফা বেড়েছে। এই ওঠানামার পটভূমিতে স্পষ্ট হয়, বাজারে অযৌক্তিক মূল্যস্ফীতি সরাসরি চাহিদা ও জোগানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং এটি অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিলোভ, দায়িত্বহীনতা ও অতিরিক্ত মুনাফার প্রতিফলন।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে। সরকারপ্রধান দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটা সত্যি যে দায়িত্ব নিয়েই বাজারের অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের পক্ষে সহজ কাজ নয়। কিন্তু অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকার যে কঠোর, সেই বার্তা অবশ্যই দিতে হবে। তবে এটা মনে রাখা জরুরি যে বাজার ব্যবস্থাপনা কোনো একক নিয়ামকের ওপর নির্ভর করে না। নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় ও যৌক্তিক রাখতে গেলে বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা, কঠোর বাজার তদারকি, নিত্যপণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং যে দলের হোক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা—এই চারের সম্মিলন ঘটা জরুরি।
অতীতে কোনো সরকারকেই বাজার ব্যবস্থাপনাকে সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে আগ্রহী দেখা যায়নি। বাংলাদেশের বাজার তদারকি ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম দুর্বল ব্যবস্থা। বাজার তদারকির জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল এটি। সরকারকে অবশ্যই বাজার তদারকি ব্যবস্থাকে শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। শুধু রমজান মাস নয়, সারা বছর ধরেই তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর থাকতে হবে।
রমজানের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার এই ‘নিয়ম’ একটি গভীর দার্শনিক প্যারাডক্সের উদ্ভব ঘটিয়েছে। একদিকে রাষ্ট্র বারবার ঘোষণা দিয়ে যেন জনগণকে সতর্কতার আলোকে আলোকিত করতে চায়; অন্যদিকে বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যায্য বণ্টনের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতার নিদর্শন ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ব্যর্থতা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি সামাজিক নৈতিকতারও পরিপূর্ণ অবক্ষয়কে প্রতিফলিত করে।
আমরা আশা করি, নতুন সরকার তাদের প্রতিশ্রুতি ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেবে। সাধারণ মানুষের জীবনে অবশ্যই স্বস্তি ফেরাতে হবে।