অচল টেকনাফ স্থলবন্দর

সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিন

দেশের দক্ষিণের একমাত্র স্থলবন্দর টেকনাফ এখন যেন এক নীরব জনপদ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত এবং নিরাপত্তার কারণে এক বছর ধরে এই বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। যে বন্দর একসময় পণ্যবোঝাই ট্রলার, ট্রাক আর হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকত, সেখানে আজ কেবলই শূন্যতা। বন্দরের এই স্থবিরতা কেবল বাণিজ্যিক ক্ষতি নয়; বরং সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনীতির জন্যও অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টেকনাফ স্থলবন্দর অচল থাকায় অনেক ব্যবসায়ীর শত শত কোটি টাকার পণ্য মিয়ানমারে আটকে আছে। এর মধ্যে পচনশীল অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। অন্যদিকে বন্দরকেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহ করা প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এখন দিশাহারা। কাজ হারিয়ে শ্রমিকের সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে। এ ছাড়া প্রতিদিন গড়ে চার কোটি টাকা করে এক বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। একটি উন্নয়নকামী রাষ্ট্রের জন্য এই ক্ষতি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈধ পথে বাণিজ্য বন্ধ থাকলেও সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান কিন্তু থেমে নেই। নাফ নদী ও সীমান্তের অন্তত ৩৩টি পয়েন্ট দিয়ে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি তেল যেমন পাচার হচ্ছে, তেমনি ওপার থেকে আসছে ইয়াবা, আইসের মতো মাদকদ্রব্যসহ প্রাণঘাতী অস্ত্রের চালান। অর্থাৎ বৈধ বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার সুযোগে শক্তিশালী হয়ে উঠছে একটি সিন্ডিকেট। বিজিবি ও কোস্টগার্ডের অভিযান ও বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করার খবরই সেটা প্রমাণ করার জন্যই যথেষ্ট। স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অব্যবস্থাপনার সুযোগে এই অরাজকতা কয়েক গুণ বেড়েছে।

মিয়ানমারের বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনে সব পক্ষের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের পথ খুঁজতে হবে। জেলা প্রশাসক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বাণিজ্য চালুর যে উদ্যোগের কথা বলছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সীমান্ত চোরাচালান দমনের সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার হলো বৈধ বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত রাখা।

আমরা মনে করি, কেবল বিজিবি বা কোস্টগার্ডের কড়াকড়ি দিয়ে সীমান্ত অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়, যদি না সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান
ও বৈধ আয়ের পথ নিশ্চিত হয়। টেকনাফ স্থলবন্দরকে সচল করা মানে কেবল রাজস্ব আদায় নয়, বরং একটি সীমান্ত অঞ্চলকে অপরাধমুক্ত রাখা এবং হাজার হাজার মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া। টেকনাফ স্থলবন্দর চালুর জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।