নির্বাচনী সহিংসতা

ইসিকে কঠোর, দলকে দায়িত্বশীল হতে হবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা পর্বের শুরুটা শান্তিপূর্ণ হলেও গত কয়েক দিনের সহিংসতা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত বুধবার শেরপুর-৩ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সংঘর্ষে জামায়াতের একজন নেতা নিহত হয়েছেন; আহত হয়েছেন দুই দলের কমপক্ষে ৩০ জন। নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের সংঘর্ষ ও প্রাণহানি দুঃখজনক ও অপ্রত্যাশিত। এ ছাড়া বিভিন্ন আসনে নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়া, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্বাচনী কার্যালয়ে ভাঙচুরসহ বিভিন্ন সহিংসতার প্রবণতা বাড়ছে। এ রকম সহিংসতা শেষ পর্যন্ত ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে ভয় ও শঙ্কার জন্ম দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনিয়ম ও সহিংসতা বন্ধে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও অন্তর্বর্তী সরকারকে এখন পর্যন্ত কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোও এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরুর পর বুধবার পর্যন্ত অন্তত ৩০টি আসনে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব এবং রাজনীতিতে সহিষ্ণুতার সংস্কৃতির চর্চার ঘাটতির কারণেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটতে পারে।

শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতৃত্ব পরস্পরের প্রতি সহিষ্ণু ও আন্তরিক হলে এ ধরনের দুঃখজনক পরিস্থিতি ও রক্তপাত এড়ানো যেত বলে আমরা মনে করি। উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসার মতো একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের সমর্থকদের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য। সহিংসতা ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। যেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেখানে তারা কেন কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারেনি, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। এ ঘটনায় ঝিনাইগাতীর ইউএনও ও ওসিকে প্রত্যাহার করেছে ইসি।

 ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনী সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তদন্ত করে সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণহানির কোনো স্থান নেই উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকার এক বিবৃতিতে বিএনপি, জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দলের প্রতি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।

আমরা মনে করি, নির্বাচনী সহিংসতা বন্ধে এ ধরনের বিবৃতি দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়। সহিংসতার প্রতিটি ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রচারণা পর্বের শুরু থেকে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যরা যদি নির্বাচনী আইন প্রয়োগে কঠোর হতেন, তাহলে এমন সহিংসতা হতে পারত না। নির্বাচনী আইন অমান্য করে পোস্টার টাঙানো, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপকরণে তৈরি ব্যানার-ফেস্টুন ব্যবহার, শব্দমাত্রার সীমা লঙ্ঘন করে মাইক ব্যবহারের মতো আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশনকে এখন পর্যন্ত শক্ত ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব তৈরি করতে পারে কিংবা নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা উসকে দিতে পারে—এমন পোস্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা ভিডিও ছড়ানো হলেও এর বিরুদ্ধেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হবে, সে ঘোষণা সরকারের তরফ থেকে অনেক আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল। সে বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতির যথেষ্ট সময় পেয়েছে। ফলে তাদের কঠোর না হতে পারার পেছনে কোনো বাস্তব কারণ নেই। যেকোনো সহিংসতা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ইসি যে কঠোর ও শূন্য সহিষ্ণু, সেই বার্তা তাদের জোরালোভাবে দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বকেও সংযত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।