২০১৯ সালে বাংলাদেশের নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উচ্চ আদালতের এই রায় পরিবেশ ও নদী রক্ষায় নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের আগ্রাসন থেকে নদী বাঁচানোর আশাবাদ তৈরি হলেও বাস্তবে অবৈধ দখল ও দূষণ বন্ধ করা যায়নি। এর সবচেয়ে বড় কারণ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর কেন্দ্রীয় অভিভাবক ঘোষণা করা হলেও সংস্থাটির আইনি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন, পাউবোসহ যেসব সংস্থা নদী রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত, তাদের প্রশ্নবিদ্ধ ও আইনবহির্ভূত ভূমিকা নদী রক্ষায় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খুলনার আমতলা নদী এর জলজ্যান্ত একটি দৃষ্টান্ত। বদ্ধ জলাশয় দেখিয়ে জেলা প্রশাসন নদীটিকে ইজারা দেওয়ায় শুধু নদী নয়; স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রাণপ্রকৃতি ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ২০২৩ সালে খুলনা জেলা প্রশাসন আমতলা নদীকে ৬০ একর আয়তনের ‘বদ্ধ জলাশয়’ দেখিয়ে গঙ্গারামপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে বার্ষিক ১ লাখ ১০ হাজার টাকা ইজারামূল্যে ছয় বছরের জন্য বন্দোবস্ত দেয়। নদীর বিভিন্ন স্থানে আড়াআড়িভাবে বাঁশের পাটা বসানো হয়। এতে আমতলা নদীর দুই প্রান্তের স্লুইসগেট এবং মাঝামাঝি খেজুরতলা গেট দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
আমতলা নদী ও খালগুলো পুরো এলাকার কৃষি, পানিনিষ্কাশন ও মৎস্যসম্পদের প্রাণরেখা। ইজারা দেওয়ার কারণে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়া লবণপানি প্রবেশ করিয়ে চিংড়ি চাষ করায় কৃষিজমি ও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
আমতলা নদীর ইজারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাসের বিষয় হয়ে রয়েছে। স্থানীয় লোকজনের দীর্ঘ আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের আদেশে নদীর ইজারাসংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত ছিল। ১২ বছর পর নদী, প্রাণপ্রকৃতি-পরিবেশ ও জীবন-জীবিকার বড় সর্বনাশ হবে জেনেও জেলা প্রশাসন কীভাবে নদী ইজারা দিতে পারে? এটি ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের লঙ্ঘন এবং ২০১৯ সালের উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপন্থী।
শুধু আমতলা নদী নয়; দেশের আরও নদ-নদীর ক্ষেত্রেও বদ্ধ জলাশয় কিংবা খাল দেখিয়ে ইজারা দেওয়ার ঘটনা আমরা দেখেছি। নদী সুরক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ও সরকারি সংস্থাগুলো নদীর ক্ষতিসাধনে জড়িত, এমন অভিযোগ নদী আন্দোলনকারীরা বহু বছর ধরেই করে আসছেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি, নদী হত্যার এই অপরাধে জড়িত থাকার পরও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আমতলা নদীর ইজারা সমবায় সমিতির নামে দেওয়া হলেও এর পেছনে রয়েছেন ২০২৪–এর আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা। আমরা মনে করি, আমতলা নদী যাঁরা ইজারা দিয়েছেন এবং যাঁরা ইজারা নিয়েছেন, তাঁদের সবাইকেই জবাবদিহি ও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে এমন বাজে নজির যাতে আর স্থাপিত না হয়, তার জন্যই এটা করা জরুরি।
নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর আইনি অভিভাবক করা হলেও কমিশন শক্তিশালী না হওয়ায় সংস্থাটি নদী সংরক্ষণে বাস্তবে কোনো কাজই করতে পারছে না। সরকার নদী রক্ষা কমিশন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা মনে করি, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের স্বায়ত্তশাসন ছাড়া নদী দখল, দূষণের মহামারি বন্ধ করা যাবে না।