২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি ও পদায়ন বন্ধ রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জমে থাকা আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। তবে শিক্ষকদের বদলি ও পদায়নে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা থেকে সরে এসে আবারও সনাতন ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং কমিটিতে গণ্যমান্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নতুন এই ব্যবস্থা একদিকে যেমন তদবির ও দুর্নীতিকে উৎসাহিত করতে পারে, অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষকদের ভোগান্তি বাড়াতে পারে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছ, ২১ জুন এক প্রজ্ঞাপনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বদলি ও পদায়ন উপজেলা বা থানা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়—এই চার স্তরের কমিটির মাধ্যমে জাতীয় কমিটির সভাপতি হবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব। বিভাগীয় কমিটির সভাপতি বিভাগীয় কমিশনার, জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা বা থানা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রতিটি কমিটিতে সভাপতির মনোনীত দুজন করে গণ্যমান্য ব্যক্তি সদস্য থাকবেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, শিক্ষক বদলির পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়নের আগপর্যন্ত সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে এই কমিটিভিত্তিক ব্যবস্থা থাকবে। অনলাইন সফটওয়্যারের মাধ্যমে যেখানে প্রাথমিক শিক্ষকদের বদলির কাজটি হতো, সেখানে নীতিমালা প্রণয়নের যুক্তিতে কেন ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া? স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটিতে ত্রুটি বা ঘাটতি থাকলে সেটা উত্তরণে উদ্যোগ নেওয়াটা যুক্তিযুক্ত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশ সব সময়ই সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। সরকারের এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থা থেকে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তর ঘুষ, দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত পদ্ধতি।
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় পৌনে চার লাখ। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের বদলি ও পদোন্নতির প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিকেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। তবে সেটা অবশ্যই ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা হতে হবে। নতুন পদ্ধতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে কমিটিতে ‘গণ্যমান্য ব্যক্তি’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি শিক্ষকদের বদলি ও পদায়ন মূলত একটি প্রশাসনিক ও বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় গণ্যমান্য ব্যক্তির ভূমিকা থাকতে পারে না। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, গণ্যমান্য ব্যক্তির সংজ্ঞা নির্ধারণ না করায় কমিটিতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই যুক্ত হবেন। সে ক্ষেত্রে শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক প্রভাব ও হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হবে। তদবির ও রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করায় সাধারণ শিক্ষকদের ভোগান্তি বাড়তে পারে।
আমরা মনে করি, বদলি ও পদোন্নতির চার স্তরের কমিটিকে যেভাবে আমলানির্ভর করে তোলা হয়েছে, সেটাও যৌক্তিক হতে পারে না। সমন্বিত অনলাইন বদলি নির্দেশিকা–২০২৩ জারি করার পর, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের অনলাইন সফটওয়্যারের মাধ্যমেই বদলি করা যেত। মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তারাই এ ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব পালন করতেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলি ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া অবশ্যই সুস্পষ্ট মানদণ্ড ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হতে হবে। বদলির ক্ষেত্রে শূন্য পদের তথ্য, চাকরির মেয়াদ, দুর্গম এলাকায় কর্মকাল, নিজ বাড়ি থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব, পারিবারিক অবস্থা, স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনসহ বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় বদলির ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব। শিক্ষা খাতে যেখানে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে, সেখানে শিক্ষক বদলিতে ব্যক্তি ও কমিটিনির্ভর ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার মানে হচ্ছে স্রেফ পশ্চাদপসারণ।