রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও ডিজিটাল সেবা নকশা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেই অঙ্গীকার এখনো পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, টেলিযোগাযোগসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র দ্রুত ডিজিটাল হয়েছে। কিন্তু এই রূপান্তরের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এর ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী কার্যত ডিজিটাল সেবার বাইরে রয়ে গেছে।
ডিজিটাল সেবা আজ আর শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়। এটি নাগরিক অধিকার, অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সরকারি সেবা নিতে না পারা, আর্থিক লেনদেনের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া বা যোগাযোগসেবায় বাধার মুখে পড়া—এসব অভিজ্ঞতা একজন নাগরিকের স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার বাদ দিয়ে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন অনুযায়ী ১২ ধরনের প্রতিবন্ধকতা স্বীকৃত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩৩ হাজারের বেশি সরকারি ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল নাগরিক সেবা চালু রয়েছে। অথচ এই বিপুল ডিজিটাল পরিসরের বড় অংশই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহারযোগ্য নয়। এটি গুরুতর নীতিগত ঘাটতির ইঙ্গিত।
বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্ক্রিন রিডার-সমর্থনহীন ডিজাইন, কি–বোর্ড নেভিগেশনের অভাব, ক্যাপচা কোডের মতো বাধা তাদের স্বনির্ভরভাবে সেবা গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। ব্যাংকিং খাতেও একই চিত্র। এটিএম বুথে সহায়ক প্রযুক্তির অভাব এবং মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপে প্রয়োজনীয় অ্যাকসেসিবিলিটি সুবিধা না থাকায় আর্থিক লেনদেনের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
টেলিযোগাযোগ খাতে গ্রাহক শনাক্তকরণে আঙুলের ছাপকে একমাত্র উপায় হিসেবে ব্যবহার করাও অনেক শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, যা ডিজিটাল সেবার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। এই কনভেনশন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিসহ সব সেবায় সমান অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে। বাস্তবে এই অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে ডিজিটাল সেবা নকশায় ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’কে ঐচ্ছিক নয়, বাধ্যতামূলক মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
আমরা আশা করি, উদ্যোগ নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরাসরি অংশগ্রহণে ডিজিটাল সেবা নকশা, আন্তর্জাতিক প্রবেশগম্যতা মান অনুসরণ এবং নিয়মিত তদারকির বিষয়ে সরকার সুনজর দেবে।