সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

কক্সবাজারের বিপন্ন হাতি

সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি

কক্সবাজারের রামুর খুটাখালীতে শরীরে ৬১ গ্রাম ওজনের গুলির ক্ষত নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে একটি মা হাতির মৃত্যু আমাদের প্রকৃতির এক চরম নিষ্ঠুর বাস্তবতা সামনে এনেছে। এই করুণ মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দেশে বন্য হাতির অস্তিত্বসংকটেরই ধারাবাহিক চিত্র। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বৈদ্যুতিক শক, গুলি, মাইন বিস্ফোরণ, খাদ্যসংকটসহ নানা কারণে অন্তত ১২৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মৃত্যুর বেশির ভাগই মানবসৃষ্ট এবং প্রতিরোধযোগ্য ছিল।

একসময় দেশের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে হাতির অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বনভূমি উজাড়, বসতি স্থাপন এবং দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের মতো অবকাঠামো নির্মাণের কারণে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডর আজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ঘোষিত ১২টি হাতি-করিডরের অনেক অংশ এখন স্থানীয় জনবসতি, বাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনার দখলে। ফলে চিরাচরিত পথ হারিয়ে খাবারের সন্ধানে হাতিরা লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। এতে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানুষ-হাতি সংঘাত, হাতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষও। ২০১৩-১৪ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ জন মানুষ মারা গেছেন, আহত হয়েছেন ৫২২ জন। আবাদি জমি রক্ষায় স্থানীয় লোকজনের পাতা অবৈধ বৈদ্যুতিক তার বন্য প্রাণীর জন্য বড় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ধ্বংস হাতির সঙ্গে মানুষের সংঘাতের শর্ত তৈরি করে দিচ্ছে—উভয়কেই গুনতে হচ্ছে এক ভয়াবহ মাশুল।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো বন্য প্রাণী হত্যার ঘটনা ঘটলেও এর কোনো আইনি প্রতিকার মিলছে না। গত এক দশকে হাতি হত্যার ঘটনায় ৩৩টি মামলা হলেও মাত্র একটির বিচার সম্পন্ন হওয়া আইনের মন্থর গতি ও জবাবদিহির চরম অভাবকেই নির্দেশ করে। এই আইনি শিথিলতা অপরাধীদের আরও পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতি ঠেকাতে বন মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত ৩৯ কোটি টাকার ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। ২০২৮ সাল পর্যন্ত মেয়াদি এই প্রকল্পে অভয়ারণ্য তৈরি, করিডর পুনরুদ্ধার ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। তবে শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, এর সুষ্ঠু ও কঠোর বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। বনের ভেতর হাতির খাবার নিশ্চিত করার পাশাপাশি করিডরগুলো দ্রুত দখলমুক্ত করতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় পরিবেশ ও বন্য প্রাণীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাতি হত্যার বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করাও জরুরি। হাতি হত্যা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় প্রকাশ করে যাচ্ছে প্রথম আলো। হাতি হত্যা রোধে করণীয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর অজানা নয়। ফলে হাতির এই বিপন্ন দশা ঠেকাতে সবচেয়ে জরুরি সদিচ্ছা।