সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

ঐক্য–পুনর্গঠনের ইতিবাচক বার্তা

গণতন্ত্র সুরক্ষায় তারেক রহমানের অঙ্গীকার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই–তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয় লাভের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে বিভাজন কাটিয়ে জাতীয় ঐক্য ও পুনর্গঠনের বার্তা দিয়েছেন। নির্বাচনের পর গত শনিবার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তিনি এ কথা বলেন। নিজের বক্তব্য ও প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দল ও বিরোধী দল সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রতিশোধের রাজনীতি বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন।

নির্বাচিত হওয়ার পর তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক চর্চা।

সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকারি দল ও বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।

ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি এবং গণতন্ত্রের প্রতি আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হলেও গত ৫৪ বছরে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে ইতিহাসের খুব কম সময়েই সংসদকে কার্যকর করে তোলা গেছে। ফলে রাজনীতির কেন্দ্র সংসদ হয়নি; হয়েছে রাজপথ। রাজনৈতিক এই সংকট ও বিরোধে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেশের সাধারণ নাগরিকেরা; মূল্য দিতে হয়েছে অর্থনীতিকে।

চব্বিশের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিকে পুরোনো ধারা থেকে বের করে আনার সম্ভাবনা তৈরি করে দেয়। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একটি পরিচ্ছন্ন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তারেক রহমানের বক্তব্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার ইঙ্গিত মিলছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে যে নির্বাচন–পরবর্তী কয়েকটি দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় থাকে। এবারও দেশের কয়েকটি জেলায় সংঘাত, মারামারির মতো অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক ঘটনায় হতাহতের খবর জানা গেছে। তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে ভুল–বোঝাবুঝি ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও তা যেন কোনোভাবেই সহিংসতায় রূপ না পায়, সেই আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই বক্তব্যে বিজয়ী দল হিসেবে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতা–কর্মীরা সংযত আচরণ করবেন, এমনটাই আমরা আশা করি। তবে সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাটাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত।

অর্থনৈতিক প্রয়োজন, জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে বলে তারেক রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে বাস্তবসম্মত বলেই আমরা মনে করি। নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তোলা এবং অকার্যকর হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল সরকার। দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় নতুন সরকারের জন্য দেশকে স্থিতিশীল রাখা সহজ হবে। তবে তার জন্য সরকারি দলকে আমাদের এখানে চলে আসা ‘বিজয়ীরা সব নিয়ে নেবে’, এই চর্চা থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। আমরা আশা করি, সরকারি দল হিসেবে বিএনপি এই চর্চা থেকে বেরিয়ে আসার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।

তারেক রহমানের নির্বাচন–পরবর্তী বক্তব্যে ঐক্য ও সমঝোতা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি এসেছে, সেটা বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে অত্যন্ত ইতিবাচক। আমরা তাঁর এই অবস্থান ও বক্তব্যকে স্বাগত জানাই। সরকার গঠনের পর এসব নীতি ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে তিনি আন্তরিক হবেন, সেটাই প্রত্যাশিত।