দিনাজপুর থেকে নোয়াখালী—দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একমুঠো অন্নের সংস্থানে যাচ্ছিলেন ১৩ জন কৃষিশ্রমিক। লক্ষ্য ছিল বোরো ধান কাটা। কিন্তু কুমিল্লার দাউদকান্দিতে চালবোঝাই ট্রাক খাদে পড়ে প্রাণ হারালেন ৭ জন। এটি শুধু সড়ক দুর্ঘটনা নয়, আমাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষের অসহায়ত্ব ও জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতার এক করুণ বাস্তবতা।
আমাদের কৃষি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত পয়লা বৈশাখের উৎসব। কিন্তু সেই কৃষি ও কৃষকের কী হাল এখন, তা আমরা দেখতে পারি এমন ঘটনার মধ্য দিয়েও। পয়লা বৈশাখ শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে কৃষিশ্রমিকদের এমন মৃত্যু আমাদের আরও বেশি ব্যথিত করে। আগেও এমন দুর্ঘটনায় কৃষিশ্রমিক বা শ্রমিকের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, স্রেফ বাসভাড়া বাঁচানোর জন্য তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালবাহী ট্রাকের ওপর সওয়ার হয়েছিলেন। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ ও বিরামপুর উপজেলার এই মানুষগুলো দারিদ্র্যের কশাঘাতে এতটাই জর্জরিত যে নিরাপদ ভ্রমণের খরচ জোগানোর চেয়ে কয়েক শ টাকা বাঁচানোই তাঁদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সেই সামান্য অর্থ বাঁচাতে গিয়ে আজ সাতটি পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেল।
দেশের প্রচলিত আইনে পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু মহাসড়কগুলোয় প্রশাসনের চোখের সামনেই নিয়মিত ট্রাকে করে মানুষ যাতায়াত করছে। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গে শ্রমিকদের এভাবে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া এক নিয়মিত ও ভয়ংকর দৃশ্য। দাউদকান্দির হাসানপুর এলাকায় দিবাগত রাত পৌনে তিনটার দিকে যখন এই দুর্ঘটনা ঘটে, তখন হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি কোথায় ছিল?
নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার এবং আহত ব্যক্তিদের ১৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর জন্য এই সামান্য অর্থ হয়তো দাফন-কাফনের খরচ মেটাবে, কিন্তু যে পরিবারগুলো তাদের একমাত্র অভিভাবককে হারাল, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কী হবে? দিনাজপুরের নিভৃত গ্রামের সেই শিশুদের পড়াশোনা আর দুই বেলা খাবারের সংস্থান কে করবে?
আমরা মনে করি, শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারি ট্রাস্ট বা তহবিল আছে। কোটি কোটি টাকা সেখানে পড়ে আছে। এ তহবিলের কোনো প্রচার নেই। ভুক্তভোগীরা যে সহায়তা পাবেন, সেখানেও তৈরি করে রাখা হয়েছে নানা জটিলতা। আমরা আশা করব, দিনাজপুরের প্রশাসন এ তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ পেতে কৃষিশ্রমিকদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবে।
মহাসড়কে ট্রাকে যাত্রী পরিবহন বন্ধে হাইওয়ে পুলিশকে আরও কঠোর ও দায়বদ্ধ হতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি মৌসুমে দূরদূরান্ত থেকে আসা শ্রমিকদের যাতায়াতে বিশেষ এবং নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থার কথা সরকারকে ভাবতে হবে।