পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অবহেলা বা বৈষম্য একটি আলোচিত বিষয়। পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় পর্যন্ত যেভাবে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, সে অনুযায়ী স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য পৌঁছায়নি স্বাস্থ্যসুবিধা। পাহাড়ের শিশুরাও শিক্ষা অর্জনে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের ২৫০ শয্যার নতুন ভবন আট বছরেও শেষ না হওয়ার খবর আরও বেশি হতাশাজনক।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলাসহ প্রতিবেশী রাঙামাটির লংগদু ও বাঘাইছড়ি এলাকার জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল এই হাসপাতাল। বর্তমানে ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ২ হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। ধারণক্ষমতার অর্ধেকের বেশি (২৩০ জন) রোগী ভর্তি থাকায় শিশু, বৃদ্ধসহ মুমূর্ষু রোগীদেরও বারান্দা ও ড্রেনের পাশের মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
২০১৮ সালে শুরু হওয়া ২৫০ শয্যার নতুন ভবনের কাজ ২০২৪ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আট বছর পরও তা ৭৫ শতাংশের বেশি এগোয়নি। ফলে ভবন না থাকায় আধুনিক আইসিইউ, কিডনি ডায়ালাইসিস, আধুনিক ডায়াগনস্টিক সেবা চালু করা যাচ্ছে না এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্সও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সেলিম এন্টারপ্রাইজ’-এর গাফিলতি এবং গণপূর্ত বিভাগের ঢিলেঢালা নোটিশ-সংস্কৃতি পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর এক নির্মম পরিহাস তুলে ধরেছে।
একদিকে যেমন আধুনিক ভবনের অভাবে পাহাড়ের হাসপাতালগুলো জরাজীর্ণ থাকে এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছায় না; অন্যদিকে এই অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও পর্যাপ্ত শিক্ষক, অবকাঠামো এবং আর্থিক বরাদ্দের অভাবে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে এভাবে স্থবির করে রেখে একটি অঞ্চলকে জাতীয় মূলধারা থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে রাখা হচ্ছে।
একটি আধুনিক ভবন আটকে থাকার কারণে যদি হাজার হাজার নাগরিক আইসিইউ কিংবা ডায়ালাইসিসের মতো জীবন রক্ষাকারী সেবা থেকে বঞ্চিত হন, তবে সেই দায় কার? ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম দায়িত্বহীনতা সত্ত্বেও কেন কার্যকর আইনি বা প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—এই প্রশ্ন আজ প্রতিটি পাহাড়ি নাগরিকের।
আমরা মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেবল একটি ভৌগোলিক পাহাড়ি এলাকা হিসেবে না দেখে এখানকার বাসিন্দাদের নাগরিক অধিকারের বিষয়টি কেন্দ্রীয় নীতিমালায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুততম সময়ে শেষ করে জরুরি সেবাগুলো চালু করা এখন সময়ের দাবি। পার্বত্য তিন জেলার হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।