ভারত থেকে নেমে আসা ঢল আর টানা বৃষ্টিতে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তিস্তার পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের শেষ সম্বল বাদাম ও সবজিখেত। লোকসান কমাতে পানির নিচ থেকে আধা পাকা বাদাম তুলে এনে সড়কে শুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন দুর্গত কৃষকেরা। ঠিক এমন এক মানবিক সংকটের মুহূর্তে বন্যাকবলিত এলাকায় উপজেলা কৃষি বিভাগের সবজিবীজ বিতরণ কর্মসূচি ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা অত্যন্ত যৌক্তিক। একই সঙ্গে এটি প্রশাসনের খামখেয়ালির বহিঃপ্রকাশও।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চর খিতাবখাঁ-বুড়িরহাট এলাকার কৃষকেরা যখন খেতের ফসল হারিয়ে দিশাহারা, যখন তাঁদের মনে তাড়া করছে বন্যার পূর্বাভাস, নিরাপদ আশ্রয় আর ত্রাণের চিন্তা; তখন উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ হাজির হয়েছে সবজিবীজ নিয়ে। পানিতে যেখানে সবজিখেতই তলিয়ে গেছে, সেখানে এই মুহূর্তে বীজ দিয়ে কৃষকেরা কী করবেন? দুর্গত মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে না পারা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের বিচ্ছিন্নতাই প্রকাশ পায়।
কৃষকদের খোঁজখবর না নেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাজারহাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বক্তব্য, ‘বন্যায় পানিবন্দী মানুষের জন্য আমি কী পরামর্শ দেব? সবজির বীজ বিতরণ কৃষি বিভাগের কার্যক্রম, আমি শুধু সঙ্গে এসেছি।’ একটি উপজেলার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দুর্যোগের সময়ে পানিবন্দী ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, উদ্ধার তৎপরতা ও পুনর্বাসনে তদারকি করা তাঁর দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বে হেলাফেলা করার কোনো সুযোগ থাকতে পারে না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রথম শর্তই হলো আপৎকালীন সময়ে মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া। কৃষি বিভাগের রুটিনমাফিক সরকারি কর্মসূচির কোটা পূরণ করার জন্য বন্যাকবলিত এলাকার মানুষকে বেছে নেওয়া কেবল অহেতুকই নয়; বরং সংকটাপন্ন মানুষের সঙ্গে একধরনের তামাশা। কৃষি কর্মকর্তার বাদাম শুকানো–সংক্রান্ত কারিগরি পরামর্শগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তার আগে মাঠে গিয়ে কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তালিকা করা এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি ছিল।
কুড়িগ্রামের নদ-নদীর পানি ওঠানামা করছে এবং দুধকুমার নদের পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। আমরা আশা করি, রাজারহাট উপজেলা প্রশাসন ও জেলা কর্তৃপক্ষ অনতিবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খাদ্যসহায়তা, চরের মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। কৃষি বিভাগের প্রতি প্রত্যাশা, দায়সার কার্যক্রম নয়, কৃষকের প্রতি তারা আরও আন্তরিক হবে, কৃষকের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে আরও দায়িত্বশীল হবে।