নির্বাচনে ‘ডিপফেক’ আতঙ্ক

ইসিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, অপতথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে বানানো মিথ্যা ভিডিও নিয়ে ততই শঙ্কা বাড়ছে। এআই দিয়ে বানানো মিথ্যা ভিডিও বা ডিপফেক এবং সস্তা সফটওয়্যার ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে ভুয়া বক্তব্য প্রচার বা চিপফেক যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তার বহু উদাহরণ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, তুরস্ক, আর্জেন্টিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো। দেখা যায়, বিভিন্ন স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ডিপফেক ও চিপফেক তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব তৈরি থেকে শুরু করে নির্বাচন পেছানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। 

বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে ডিজিটাল সাক্ষরতার চিত্র আক্ষরিক অর্থেই করুণ, সেখানে এমন ঝুঁকি অনেক বেশি বলেই সতর্ক করে আসছিল তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলো ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদেরা। অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন নানা সময়ে নির্বাচনে অপতথ্য এবং ডিপফেক ও চিপফেকের ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে বারবার কথা বললেও এটা ঠেকাতে বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বললেই চলে। এই দুর্বলতাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের অনুসারী ও বটবাহিনী (ভুয়া পরিচয়ে খোলা ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টের বাহিনী) দিয়ে রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও আলোচিতদের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়াচ্ছে। তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, বিভিন্ন দলের অন্তত ১৩ জন নেতা এমন অপতথ্যের ভুক্তভোগী হয়েছেন।

নির্বাচন ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে বিভিন্ন গোষ্ঠী যে ভুল তথ্য ও ভিডিওভিত্তিক অপতথ্যের বিস্তার করছে, তার পরিষ্কার তথ্য মিলেছে তথ্য যাচাইকারী সংস্থা রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে। সংস্থাটি গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে ১ হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করে, যার ৯৫৬টিই রাজনৈতিক। সবচেয়ে বেশি মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে মিথ্যা ভিডিওর মাধ্যমে।

ডিজিটাল পরিসরে ডিপফেক, চিপফেকের মতো অপতথ্য ছড়ানোর কৌশলকে বিশ্লেষকেরা নির্বাচনে প্রচলিত সহিংসতার পাশাপাশি হুমকি বলে মনে করেন। কেননা হাতে থাকা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে এআই দিয়ে বানানো ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে ভোটারের বিশ্বাসকেই নাড়িয়ে দেওয়া যায়। নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার, রাজনৈতিক দল—সব পক্ষকেই ডিপফেক, চিপফেকের মতো নতুন এই বাস্তবতা যে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি, সে বিষয়ে সতর্কতা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে নির্বাচন কমিশনকেই অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে হবে। 

ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি। সিআইডিও এ বিষয়ে নজরদারি করছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন এমন পদক্ষেপ অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যথেষ্ট নয় বলেই আমরা মনে করি। অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তথ্য যাচাইকারী সংস্থার সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ এখানে প্রয়োজন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী ফেসবুক, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিও, অডিও ও ছবি ছড়িয়ে দিচ্ছে। আবার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও টেলিগ্রামসহ অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ তৈরি করে অপতথ্য ছড়াচ্ছেন। দেশ ও বিদেশ—দুই জায়গায় বসেই অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ফলে যেসব অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো শনাক্ত করাটাই যথেষ্ট নয়; এর পেছনে কারা জড়িত, তদন্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

আমরা মনে করি, ডিপফেক, চিপফেকের মতো বিপদ থেকে নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে (আরপিও) যে সংশোধনী আনা হয়েছে, তার প্রয়োগ কঠোরভাবে হতে হবে। কোনো প্রার্থী ও দল প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জন্য হানিকর এমন কৌশল ব্যবহার করলে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণ ভোটারদের কাছে ডিপফেক, চিপফেকের বিপদ, ঝুঁকি ও শনাক্তের উপায় নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে বিশেষ প্রচার চালাতে হবে।