সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম

খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না

সারা দেশে সারের ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার বিষয়টি উল্লেখ করা থাকলেও তা লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় সুপারিশকেই তালিকা তৈরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দলীয় লোক ও অনভিজ্ঞরা ডিলারশিপ পাওয়ায় ভবিষ্যতে সার নিয়ে সংকট আরও তীব্র আকার নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেখানে যদি সার নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়, তাহলে আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার যে সুপারিশ করেছে, সেটা অত্যন্ত যৌক্তিক। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, সোমবারের বৈঠকে সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ ক্ষোভ ও অসন্তোষও প্রকাশ করেন। যেসব জায়গায় অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, সেখানে আপাতত সারের ডিলারশিপ স্থগিত রাখার কথাও আলোচিত হয়েছে। আমরা মনে করি, দ্রুত এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সরকারকে ন্যায্য ও কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে।

সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার সার ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় ডিলারদের আংশিক তালিকা প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের সার ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও অন্যান্য আত্মীয়কেও ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অথচ সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া আবেদনকারীর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে।

২২ অক্টোবর প্রথম আলোর লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ডিলার হিসেবে মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। এঁদের প্রায় কারও সার ব্যবসার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এক–দুই যুগ ধরে সারের ব্যবসা করছেন এমন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরাও তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

শুধু লক্ষ্মীপুর নয়, সারা দেশের চিত্রই কমবেশি এ রকম। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে গণমাধ্যমের খবর বলছে, ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই অনভিজ্ঞ ও নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী। সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জমা দেওয়া সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে যোগ্যতার পরিবর্তে অনুগত ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দেওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগে নিজেদের পছন্দের লোকদের সুযোগ দিতে প্রভাবশালী মহলের চাপ রয়েছে। এটা হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়তে পারেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, জেনেশুনে সরকার কেন এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে। সার পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হলে কৃষকদের ভোগান্তি ও উৎপাদনের খরচ—দুই-ই বাড়ে। সম্প্রতি আমন মৌসুমে সার না পেয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গুদাম ভাঙা থেকে শুরু করে সড়ক অবরোধের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার পরও সারের ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।

খাদ্যনিরাপত্তার জরুরি প্রশ্নটি জড়িত থাকায় সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে যে নীতিমালা রয়েছে, তা লঙ্ঘন করার সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করি না। সার পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় কোনো ঝুঁকি তৈরি করা যাবে না।