দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সবচেয়ে জরুরি

প্রায় তিন বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনযাপনের জন্য কত বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে, জাতীয় ও বৈশ্বিক সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপগুলো তার স্পষ্ট উদাহরণ। 

গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, চার দশক ধরে কমা দারিদ্র্য গত চার বছরে বেড়েছে। এর পেছনে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে একটা বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিপিআরসির আগস্ট মাসের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে খাবার কিনতে গিয়েই পরিবারগুলোকে মোট আয়ের ৫৫ শতাংশ ব্যয় করতে হয়। প্রশ্ন হলো, তাহলে শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন, যাতায়াত, বিনোদনের মতো খরচ কোথা থেকে সংস্থান হবে? খুব স্বাভাবিকভাবেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেশির ভাগ মানুষকে প্রয়োজনীয় খরচ কাঁটছাট করে কায়দা করে জীবন ধারণ করতে হচ্ছে।

জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগের প্রতিবেদনও বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ে কোনো সুখবর দিচ্ছে না। প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে, বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ বাদে অন্য সব কটি দেশের মূল্যস্ফীতি ৫–এর নিচে। অর্থনৈতিক সংকটে দেউলিয়া হতে বসা শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি সবচেয়ে সহনীয়। গণ–অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক যাত্রা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংস্কার কর্মসূচির মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি এখন শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৭ দশমিক ১ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে জীবনধারণের জন্য এটিও সহনীয় মাত্রার মূল্যস্ফীতি নয়। অর্থনীতির ভাষায় মূল্যস্ফীতিকে সাধারণ মানুষের জন্য নীরব ঘাতক বলা হয়। মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যায়। বাস্তবতা হলো, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেশির ভাগ মানুষের বেতন, মজুরি ও আয় বাড়েনি। ফলে অনেক মানুষের মাসিক আয়ের পুরোটাই সংসার চালাতে খরচ হয়ে যাচ্ছে। অনেককে আবার ধারদেনা করে কিংবা সঞ্চয়পত্র ভেঙে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে।

গত সরকারের আমলে মূল্যস্ফীতিসহ অন্যান্য তথ্য–উপাত্তের প্রকৃত চিত্র লুকানো হতো। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিসংখ্যান ব্যুরো তথ্য বিকৃতির সেই ধারা থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসতে পেরেছে। ফলে বাস্তব পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্রটা পাওয়া যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সুদের হার বাড়িয়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক–কর কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি আগের ১২–১৩ শতাংশ থেকে কমে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ৮–৯–এর ঘরে নামলেও সেটা উচ্চ মূল্যস্ফীতিই। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ২০২৫ সালের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে এক বছর আগে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন; কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটেনি। প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তান মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে পারলেও বাংলাদেশ কেন কমাতে পারেনি? এর মূল কারণ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার যেমন সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, আবার মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যেও সমন্বয়হীনতা কাজ করেছে। কৌশলগত পণ্য জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। চাঁদাবাজি ও পরিবহন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে বড় শিক্ষা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, ব্যবসা–বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই পারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির জোয়াল থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করতে।