সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

বিপন্ন বরেন্দ্র জনপদ

পানিসংকটের টেকসই সমাধান দরকার

নওগাঁর পোরশা উপজেলার অনেক নারীকে প্রতিদিন কয়েক বালতি খাওয়ার পানির জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। শুধু পোরশা নয়, বরেন্দ্র অঞ্চলের বিস্তৃত জনপদের হাজার হাজার মানুষের প্রাত্যহিক যন্ত্রণার চিত্র এটি। উত্তরের জেলা নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যে হারে নিচে নামছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়; বরং এক ভয়াবহ মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের অশনিসংকেত। দুঃখজনক হচ্ছে, গত এক দশকে একাধিক সরকার এখানে নানা পদক্ষেপ নিলেও তার সুফল মিলছে না।

সম্প্রতি সরকার এই অঞ্চলের ৩ হাজার ৫৯৩টি মৌজাকে ‘পানিসংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে বিধিনিষেধ, নতুন নলকূপ স্থাপনে বাধা এবং পানিনির্ভর ফসল চাষ কমিয়ে আনার মতো একগুচ্ছ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাগজ-কলমে এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। প্রজ্ঞাপন জারির কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও এবং খরতপ্ত চৈত্র মাসেও সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এখনো জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়নি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মাঝপথে আটকে থাকে, তখন এখানকার নারীদের কষ্ট কেবল দীর্ঘায়িতই হয়।

বরেন্দ্র অঞ্চলে এই সংকটের মূলে রয়েছে কয়েক দশকের অপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন। ধান চাষের জন্য গভীর নলকূপের লাগামহীন ব্যবহার এবং অনিয়মিত বৃষ্টির ফলে প্রকৃতি আর পানি পুনর্ভরণ (রিচার্জ) করতে পারছে না। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে মাটির নিচ থেকে পানি তোলার এই প্রতিযোগিতা একদিন মাটিকে মরুভূমি বানিয়ে ছাড়বে। আজ সেই আশঙ্কাই সত্যি হচ্ছে। হাতে চাপা নলকূপে পানি উঠছে না, পুকুর-খাল শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, এমনকি সুপেয় পানির অভাবে সামাজিক সম্পর্ক বা বিয়ের মতো পারিবারিক বন্ধনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার পর এখন সবচেয়ে জরুরি হলো এর কঠোর বাস্তবায়ন। শুধু বিধিনিষেধ আরোপ করলেই হবে না, কৃষকদের বিকল্প কম পানিনির্ভর ফসল (যেমন ডাল বা তেলবীজ) চাষে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নদীনালার নাব্যতা ফিরিয়ে এনে উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

আমরা আশা করি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করবে। বরেন্দ্রর তৃষ্ণার্ত মানুষের হাহাকার বন্ধ করতে হলে কেবল প্রজ্ঞাপন নয়, চাই দৃশ্যমান ও টেকসই সমাধান। মনে রাখতে হবে, পানি ছাড়া জীবন ও প্রকৃতি—উভয়ই অচল। এই সংকট মোকাবিলায় দেরি করার অর্থ হলো একটি বিশাল জনপদকে স্থায়ী বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া।