চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি সংরক্ষিত বনের ‘বাঁশবাগান পাহাড়ে’ অবৈধভাবে বাঁশ ও গাছপালা উজাড়ের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রায় আট একর আয়তনের এই পাহাড়ি বাঁশবাগান দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলের বুনো হাতির খাদ্যের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একটি সরকারঘোষিত সংরক্ষিত বনে এভাবে প্রকাশ্যে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাঁশ কেটে জমি খালি করার ঘটনা কেবল আইনের চরম লঙ্ঘন নয়, বরং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও বন্য প্রাণীর অস্তিত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। যদিও বন বিভাগ বনটি সুরক্ষায় এগিয়ে এসেছে, এটি প্রশংসনীয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, একটি প্রভাবশালী চক্র নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলে প্রাকৃতিক বাঁশঝাড় ও লতাগুল্ম কেটে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে বনজ গাছ রোপণের পাঁয়তারা করছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এই বন ধ্বংসের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল উদ্দেশ্যই হলো সেখানকার প্রাকৃতিক রূপ, উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণীকে অক্ষুণ্ন রাখা। সেখানে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বাঁশবাগান ধ্বংস করে বাণিজ্যিক বাগান তৈরির মানসিকতা পুরো সংরক্ষিত বনের চরিত্রকেই পাল্টে দেয়।
বনগবেষক ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে বাঁশ হাতির প্রধান খাদ্য। খাদ্যের এই প্রাকৃতিক উৎস ধ্বংস হয়ে গেলে বুনো হাতির দল বাধ্য হয়ে খাবারের সন্ধানে লোকালয় ও কৃষিজমিতে হানা দেবে। ফলে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়বে মানুষ-হাতি সংঘাত, যা ইতিমধ্যে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক মারাত্মক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। খাদ্যাভাবে হাতি লোকালয়ে এলে যেমন মানুষের জীবন ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, তেমনি ক্ষুব্ধ মানুষের পাল্টা–আক্রমণে কিংবা বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ হারায় বিরল প্রজাতির এই প্রাণী। চুনতির ঘটনাটি এই জীবনঘাতী সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।
প্রশাসনের নজর এড়িয়ে কীভাবে একটি সংরক্ষিত বনে দিনের পর দিন এমন উজাড়প্রক্রিয়া চলল? সংবাদ প্রকাশের পর বন বিভাগ অভিযান পরিচালনা, বাণিজ্যিক গাছ উচ্ছেদ এবং আবার বাঁশ রোপণের আশ্বাস দেয়। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বাঁশ ও বটগাছের চারা রোপণ করে। বন বিভাগের বক্তব্য, হাতির খাদ্য ও আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যারা ক্ষমতার দাপটে কিংবা সিন্ডিকেট গড়ে তুলে জাতীয় পরিবেশ ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করছে, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বন্য প্রাণী ও বনাঞ্চল রক্ষা কেবল কাগজে-কলমে নয়, মাঠপর্যায়ে কঠোর তদারকি ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারঘোষিত সংরক্ষিত বন রক্ষায় কোনো প্রকার ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।