সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়

দারিদ্র্যের চালচিত্র

ভুল নীতি ও দুর্নীতিতে বেড়েছে আয়বৈষম্য

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২-এর চূড়ান্ত ফলাফলে দারিদ্র্যের হার কমে আসার যে তথ্য এসেছে, তা দেশবাসীকে খুব আশ্বস্ত করে না। সার্বিকভাবে দারিদ্র্য কিছুটা কমলেও মানুষের আয়বৈষম্য বেড়েছে অনেক।

বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ওপরের ১০ শতাংশ মানুষ ৪০ শতাংশ আয় করেন। আর ৫ শতাংশের হাতে আছে মোট আয়ের ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের কাছে মোট আয়ের মাত্র ১৮ শতাংশ আছে। দারিদ্র্য কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। ছয় বছর আগে ২০১৬ সালে এই হার ছিল ২৪ দশমিক ৩। অতি দারিদ্র্যের হার এখন ৫ দশমিক ৬ হয়েছে, যা ছয় বছর আগে ছিল ১২ দশমিক ৯।

বিবিএস বলছে, গত ছয় বছরে ঢাকা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার বর্তমানে ঢাকায় ১৭ দশমিক ৯, চট্টগ্রামে ১৫ দশমিক ৮, রাজশাহীতে ১৬ দশমিক ৭, সিলেটে ১৭ দশমিক ৪, রংপুরে ২৪ দশমিক ৮ ও ময়মনসিংহে ২৪ দশমিক ২ হয়েছে। বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ দারিদ্র্যের হার ২৬ দশমিক শূন্য ৯। ২০১৬ সালে রংপুর বিভাগে সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ দারিদ্র্য ছিল।

দেশে উন্নয়ন হচ্ছে, প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের সুফল কতজন মানুষ পাচ্ছেন, সেটাও দেখার বিষয়। স্বীকার করতে হবে, উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশে আয়বৈষম্য বর্তমানে উদ্বেগজনক অবস্থায় আছে। ২০২২ সালের শেষে এসে গিনি সহগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯৯ পয়েন্ট। আর ১ পয়েন্ট বাড়লে, অর্থাৎ গিনি সহগ ৫০০ পয়েন্ট হলে উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ চিহ্নিত হবে।

এই আয়বৈষম্যের জন্য অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল থেকে সমাজের বৃহত্তর অংশ বঞ্চিত বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা। আবার জলবায়ু পরিবর্তনে প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত খুলনা জেলায় দারিদ্র্য কমা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। বরিশালের মতো খুলনাও জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত।

অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন, আয়বৈষম্যের জন্য সরকারের ভুল নীতি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী আর্থিক খাতের দুর্নীতি–অনিয়ম। বিবিএসের জরিপ প্রকাশের এক দিন আগে টিআইবি আগামী ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের হলফনামা থেকে আয় ও সম্পদের যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তাতে অবিশ্বাস্য সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মন্ত্রী-এমপিদের আয় ও সম্পদ বেড়েছে অস্বাভাবিক গতিতে, কারও কারও ক্ষেত্রে কয়েক শ গুণ। এর পাশাপাশি আর্থিক খাতেও লুটপাট চলছে বলেও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সম্প্রতি সিপিডি গবেষণা করে দেখিয়েছে, গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাত থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।

অর্থনীতিবিদেরা বিবিএসের খানা জরিপের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। খুলনা ও বরিশাল দুই বিভাগেই সমানভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা লেগেছে। সে ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী ফল হওয়ার কথা নয়। দারিদ্র্য কমলে দুই বিভাগেই কমার কথা। অন্যদিকে নতুন কোনো কর্মসংস্থান বা শিল্পকারখানা না হওয়ার পরও রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার প্রায় অর্ধেক কমে আসার ঘটনাও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। যেকোনো স্থানে দারিদ্র্য কমাতে হলে কর্মসংস্থান বাড়ানো ও শিল্পায়ন অপরিহার্য।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক মাথাপিছু মাছ, মাংস, সবজি ও দুগ্ধজাত খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে। এটা ইতিবাচক। কিন্তু খাদ্যপণ্যে মানুষের আয়ের প্রায় অর্ধেক ব্যয় করা কোনোভাবেই দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষণ নয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্রটা এমন যে ধনীরা আরও ধনী হবে, গরিবেরা আরও গরিব হবে। উন্নয়নের এই মডেল থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে যতই উন্নয়ন হোক না কেন, তার সুফল মুষ্টিমেয় মানুষই পাবে। সমাজের বৃহত্তর অংশ থেকে যাবে বঞ্চিত।