একটি নয়তলা ভবন নির্মাণে কি আট বছর সময় লাগে? বান্দরবান সদর হাসপাতালের ১০০ শয্যাকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্পটি যে কচ্ছপগতিতে এগোচ্ছে, তাতে এ প্রশ্নটিই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালে এসেও তা সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসছে না। জনগুরুত্বপূর্ণ একটি হাসপাতালের কাজ এভাবে বছরের পর বছর ঝুলে থাকা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অধিকারকে অবজ্ঞা করার শামিল।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এই ভবনের অবকাঠামো, দেয়াল, রং ও বিদ্যুৎ–সংযোগের কাজ শেষ হলেও লিফট স্থাপনসহ কিছু কাজ এখনো বাকি। অথচ দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। গত বছরের জুনে বর্ধিত মেয়াদ শেষ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বুঝিয়ে দিতে পারেনি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘রয়্যাল অ্যাসোসিয়েট’ এক মাসের মধ্যে ভবন হস্তান্তরের আশ্বাস দিলেও অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের শঙ্কিত করে।
বান্দরবানের মতো একটি দুর্গম পার্বত্য জেলায় উন্নত চিকিৎসা–সুবিধার অভাব দীর্ঘদিনের। বর্তমানে এখানে আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র), সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) বা ডায়ালাইসিসের মতো জরুরি সেবা নেই। ফলে মুমূর্ষু রোগীদের ঝুঁকি নিয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে চট্টগ্রাম শহরে যেতে হয়। এই যাতায়াতের পথে অনেকের মৃত্যুও ঘটে। নতুন ভবনটি চালু হলে আইসিইউ, সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস ইউনিটের সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু সাত বছরের দীর্ঘসূত্রতায় সেই সম্ভাবনা কেবল কাগজের পরিকল্পনাতেই আটকে আছে।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) জানিয়েছেন, বর্তমানে তাঁরা ১০০ শয্যার হাসপাতালটি চালাচ্ছেন মাত্র ৫০ শয্যার জনবল দিয়ে। এটি স্পষ্ট যে অবকাঠামো হস্তান্তর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও অত্যাধুনিক চিকিৎসার সরঞ্জাম। জেলা সিভিল সার্জনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবন হস্তান্তরের পর সরঞ্জামের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হবে। অর্থাৎ ভবন বুঝে পাওয়ার পরও আসবাব ও যন্ত্রপাতি পেতে আরও কত সময় লাগবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যসেবার মতো একটি মৌলিক বিষয় নিয়ে এ ধরনের গাফিলতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেন বারবার মেয়াদ বাড়ানোর পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করতে পারেনি, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। গণপূর্ত বিভাগকে দ্রুততম সময়ে ভবনটি বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অগ্রিম প্রস্তুতি নিতে হবে যেন ভবন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জনবল ও যন্ত্রপাতি নিয়োগ করা যায়। বান্দরবানের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আমরা আর অবহেলা দেখতে চাই না।