হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযান চালিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার এই চেষ্টা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়।
আজ থেকে ঠিক ২০০ বছর আগে, ১৮২৫ থেকে ১৮২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে, কমোডর জন রজার্সের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী নৌবহর ভূমধ্যসাগরে পাঠানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল গ্রিক জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে মার্কিন জাহাজগুলোকে রক্ষা করা।
নতুন স্বাধীন হওয়া আমেরিকান প্রজাতন্ত্র সেই সময়ে ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে যত বড় বড় কথাই বলুক না কেন, অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে গ্রিস যখন স্বাধীনতাযুদ্ধ করছিল, তখন মার্কিন নৌবহর গ্রিকদের কোনো সাহায্যও করেনি। তাদের একমাত্র স্বার্থপর উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন বাণিজ্য, বাজার এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা।
তেহরানে ‘জনগণের বিপ্লব’ ঘটানোর আহ্বান থেকে সরে আসার পর ট্রাম্পের এই ঝুঁকিপূর্ণ ইরান নীতির পেছনেও এখন কেবল সেই একই স্বার্থই বেঁচে রয়েছে।
এটি এমন এক নতুন বিশ্বের গল্প, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আলোচনার টেবিলে সমঝোতায় না এসে দুর্বলদের ওপর জোরপূর্বক নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। বিশ্ববাসীর এই উন্মুক্ত সামুদ্রিক সম্পদ বা অংশীদারত্বের ধারণা আজ ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।
সমুদ্রসীমা–সংক্রান্ত জাতিসংঘের ১৯৮২ সালের সনদটি স্বাক্ষর করেনি যুক্তরাষ্ট্র, যা উপকূলীয় কোনো দেশের হস্তক্ষেপ ছাড়াই আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধে জাহাজ চলাচলের অধিকার দেয়। তা সত্ত্বেও ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ‘মুক্ত সমুদ্র’ নীতির পক্ষে কথা বলে এসেছে। ইরানের দাবি প্রত্যাখ্যান করে গত জুনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘আন্তর্জাতিক জলসীমায় কোনো দেশই টোল বা ফি আদায় করার ক্ষমতা রাখে না।’
অথচ ট্রাম্প নিজেই পরবর্তী সময়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রও এমন টোল বসাতে পারে। পরে তিনি অবশ্য নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা পিছু হটেন। তবে গত মাসে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘সমঝোতা স্মারক’ মেনে নিয়েছে যে ওমানের পাশাপাশি ইরানেরও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর ফি নেওয়ার অধিকার রয়েছে। মার্কিন হামলা আর ট্রাম্পের হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও এই সমঝোতা স্মারকটিই কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির একমাত্র ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী অবস্থান মূলত মুক্ত সমুদ্রকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের ঐকমত্য এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে এটি পুরো আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকেও ভেঙে ফেলছে। ট্রাম্প মনে করেন, কোনো আইন, চুক্তি কিংবা আন্তর্জাতিক নীতিকে তোয়াক্কা না করে যেকোনো দেশের (বা অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের) একতরফাভাবে নিজের স্বার্থে কাজ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
অন্যান্য দেশগুলো যখন এটি অনুসরণ করছে, তখন এই দৃষ্টিভঙ্গির মারাত্মক প্রভাব প্রতিদিন দৃশ্যমান হচ্ছে। একুশ শতকের এই নতুন সমুদ্রযুদ্ধ অবশ্য বিশালাকার যুদ্ধজাহাজের মহড়া কিংবা জুটল্যান্ড বা মিডওয়ের মতো বড় সংঘাতের মতো দেখাচ্ছে না। তবে এর পেছনের কারণগুলো সেই আগের মতোই—প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, সীমান্ত, অবাধ বাণিজ্য, অর্থ ও ক্ষমতার লড়াই।
আজকের এই সমুদ্রযুদ্ধের অনেকগুলো দিক রয়েছে। যার একটি হলো হরমুজ প্রণালির এই সংকটের সূত্র ধরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক মারাত্মক প্রবণতা। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে একই ধরনের অবরোধ শুরু করেছে। তাদের দাবি, সৌদি আরবের হামলার জবাবেই এই ব্যবস্থা। চলতি সপ্তাহেই দুটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হয়েছে, যা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে আবার অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক বিধিমালার জন্য আরেকটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক আলোচনা। হরমুজ প্রণালির দেখাদেখি তারা যদি মালাক্কা প্রণালিতেও টোল চালু করে, তবে কী হবে? উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ বাণিজ্যিক পণ্য এই মালাক্কা প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। তুরস্ক যদি বসফরাস প্রণালি কিংবা স্পেন যদি জিব্রাল্টার প্রণালি পারাপারে ফি দাবি করা শুরু করে? বিশ্ববাণিজ্য এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। কারণ বিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্যই পরিবাহিত হয় জলপথে।
শুধু বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বই নয়, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে প্রকাশ্য সামুদ্রিক সংঘাতও প্রতিনিয়ত বাড়ছে—বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগর এবং তাইওয়ান প্রণালিতে। আগ্রাসী চীন যেভাবে কৃত্রিম দ্বীপ ও সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে, তার ফলে ফিলিপাইনের মতো প্রতিবেশীদের সঙ্গে প্রায়ই উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতোই বেইজিংও তাদের সুবিধামতো আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে না।
গত সপ্তাহে চীন সীমান্ত লঙ্ঘনের আরেকটি চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জাপানের সর্বদক্ষিণের দ্বীপ ওকিনোটোরি থেকে মাত্র ১৮০ কিলোমিটার দূরে, জাপানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘লাইভ-ফায়ার’ মহড়া চালিয়েছে চীনের একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী যুদ্ধজাহাজ।
টোকিও ও বেইজিংয়ের সামুদ্রিক বিরোধ পুরোনো হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীন যদি তাইওয়ান দখল করতে চায় তবে জাপানও সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। ফলে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা।
জাপান উপকূলের কাছে ওই চীনা যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি একটি রুশ যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি বিশ্ব সমুদ্রযুদ্ধের আরেক বড় খেলোয়াড়কে সামনে এনেছে। ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ২০২২ সাল থেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের গর্বের কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহর মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তাদের জাহাজগুলো এখন আর কৃষ্ণসাগর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, বাধ্য হয়ে বন্দরেই অবস্থান করছে। আর এই ব্যর্থতা ঢাকতেই যেন ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে রাশিয়া সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। বাল্টিক সাগরের তলদেশের পাইপলাইন এবং যোগাযোগ তারগুলো এখন তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।
উত্তর আটলান্টিক, উত্তর সাগর এবং ইংলিশ চ্যানেলে নিজেদের সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজের আনাগোনা বাড়িয়ে দিয়েছে রাশিয়া। গত সোমবার ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, ঠিক সেই দিনই যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে এক বিরল লাইভ-ফায়ার মহড়া চালিয়েছে রাশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজ।
ব্রিটেন ও ন্যাটোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ভয় দেখানো এবং পরখ করার জন্যই একের পর এক উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে রাশিয়া। ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে সমুদ্রে যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এসব অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
সমুদ্রে চরম অরাজকতার ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে। মার্চে শ্রীলঙ্কা উপকূলে বেআইনিভাবে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা ও ফিলিপিনো জাহাজের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ হয়। এ ছাড়া ডেনমার্কের মালিকানাধীন গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ জোরপূর্বক দখলের হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছেন ট্রাম্প এবং ভেনেজুয়েলা উপকূলে বেসামরিক নৌকায় বোমা হামলা চালিয়েছেন।
এদিকে, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে একটি পরমাণু সাবমেরিন থেকে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে চীন। তা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলিয়া।
এসব অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী এক মারাত্মক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে ত্বরান্বিত করছে। তাই বার্নহ্যামের নতুন সরকারের ওপর এখন রয়্যাল নেভির শক্তি বাড়ানোর জন্য প্রতিরক্ষা বাজেট বহুগুণ করার তীব্র চাপ রয়েছে।
বহুমুখী এই সমুদ্রযুদ্ধ আসলে একটি বড় সত্যই সামনে নিয়ে এসেছে। বহু বছর ধরে অনেক কষ্টে অর্জিত সামুদ্রিক সহযোগিতার নিয়মকানুন আজ ভেঙে পড়ছে। আন্তর্জাতিক আইনের সব নিয়মই যেন আজ সাগরের অতল জলে তলিয়ে যাচ্ছে।
এটি এমন এক নতুন বিশ্বের গল্প, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আলোচনার টেবিলে সমঝোতায় না এসে দুর্বলদের ওপর জোরপূর্বক নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। বিশ্ববাসীর এই উন্মুক্ত সামুদ্রিক সম্পদ বা অংশীদারত্বের ধারণা আজ ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।
সাইমন টিসডাল দ্য গার্ডিয়ান–এর বৈদেশিক বিষয়াবলি–সংক্রান্ত ধারাভাষ্যকার; দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত