মেজর জেনারেল জহিরুল ইসলাম

২০২৫ সালে ১৪০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্য

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় চা বোর্ডের উদ্যোগে দেশে প্রথমবারের মতো ‘জাতীয় চা দিবস’ পালিত হচ্ছে আজ ৪ জুন শুক্রবার। দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, চা-শিল্পের প্রসার’। দেশে প্রথমবার চা দিবস পালন ও চা-শিল্পের প্রসার নিয়ে প্রথম আলোকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. জহিরুল ইসলাম।

চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. জহিরুল ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন

দেশে প্রথমবারের মতো চা দিবস পালিত হচ্ছে। চা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত কীভাবে এল?

জহিরুল ইসলাম: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালের ৪ জুন প্রথম বাঙালি হিসেবে তৎকালীন চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন। এ সময় তিনি চা-শিল্পের যুগান্তকারী উন্নয়ন করেন। গবেষণার ক্ষেত্রে গতিশীলতা আনা, চা বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ভবিষ্যৎ তহবিল চালু করেন তিনি। স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ধ্বংসপ্রাপ্ত চা–শিল্পের উন্নয়নে বহু পদক্ষেপ নেন। তাঁর এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ফলে চা–শিল্প বর্তমানে একটি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর চা বোর্ডে যোগদানের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য গত বছরের ২০ জুলাই মন্ত্রিপরিষদের সভায় প্রতিবছরের ৪ জুনকে ‘জাতীয় চা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

প্রশ্ন

এবারের দিবসের প্রতিপাদ্যে রয়েছে চা–শিল্পের প্রসারের দিকটি। চা বোর্ডও ২০২৫ সালে ১৪০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এই লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব বলে মনে করেন?

জহিরুল ইসলাম: চা–শিল্পের উন্নয়নে ২০১৬ সাল থেকে ‘উন্নয়নের পথনকশা: বাংলাদেশ চা–শিল্প’ শীর্ষক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শেষ হবে ২০৩০ সালে। পথনকশা বাস্তবায়নের আগে দেশে সর্বোচ্চ চা উৎপাদন ছিল ৬৭ মিলিয়ন কেজি। পথনকশা বাস্তবায়ন শুরুর পর ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ৯৬ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন সম্ভব হয়। আবার ২০২০ সালে বাংলাদেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৫ মিলিয়ন কেজি। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গত বছর উৎপাদন হয় ৮৬ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন কেজি। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালে ১৪০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

প্রশ্ন

চা–শিল্পে বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধা ও সুরক্ষা কেমন?

জহিরুল ইসলাম: চা–শিল্পকে ৬০ শতাংশ কৃষি ও ৪০ শতাংশ শিল্প ধরা হয়। চা–শিল্পের অংশীজনেরা বর্তমানে ৯ শতাংশ হারে ঋণ পাচ্ছে। এ ছাড়া বাগানগুলো করোনাকালীন প্রণোদনা পাচ্ছে। অনলাইন চা নিলাম পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে। পূর্ণোদ্যমে অনলাইন নিলাম প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর যেকোনো স্থান থেকে চা ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। এতে চা ব্যবসায়ীরা সুবিধা পাবেন।

প্রশ্ন

চা–বাগানের শ্রমিকদের কল্যাণে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে?

জহিরুল ইসলাম: শ্রমিকদের উৎপাদনদক্ষতা বাড়ানোর জন্য শ্রমিককল্যাণকে উন্নয়নের পথনকশায় অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ হাজার ঘর ও ১৫ হাজার শৌচাগার নির্মাণ করা হবে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচ বছরে লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে পাঁচ হাজার ঘর ও পাঁচ হাজার শৌচাগার। স্বল্প মেয়াদের লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জিত হয়েছে। উন্নয়নের পথনকশায় নারী চা–শ্রমিকদের ক্ষমতায়নের জন্য চা–বাগানগুলোতে মোট ১০০টি ‘মাদার্স ক্লাব’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১০টি মাদার্স ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ বছর আরও ৪০টি মাদার্স ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া চা–বাগানের শিশুদের নিরাপত্তার জন্য ক্রেস হাউস স্থাপন করা হচ্ছে। সুপেয় পানির জন্য পাতকুয়ার পাশাপাশি স্থাপন করা হচ্ছে গভীর ও হস্তচালিত নলকূপ। ২০৩০ সালের মধ্যে স্থাপিত মোট গভীর নলকূপের সংখ্যা হবে ৪০টি। হস্তচালিত নলকূপের সংখ্যা হবে সাড়ে চার হাজার। পাতকুয়ার সংখ্যা হবে ৩০০টি।
এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিল’ ও ‘বাংলাদেশ চা–শ্রমিক শিক্ষা ট্রাস্ট’-এর মাধ্যমে চা–বাগানের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও তাঁদের পোষ্যদের শিক্ষাসহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এ দুটি তহবিলের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৮১২ জনকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ট্রাস্টের অর্থায়নে স্কুলে খেলাধুলাসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। কন্যাবিবাহ ও চিকিৎসাবাবদ অনুদান দেওয়া হচ্ছে। এমন বহু কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রশ্ন

চা বোর্ডের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জানতে চাই।

জহিরুল ইসলাম: চায়ের পুরোনো যে ঐতিহ্য রয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করাই লক্ষ্য। ২০২৫ সালে ১৪০ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণে চা বোর্ড নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। লক্ষ্য পূরণ হলে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে ২০২৫ সালে ১১ মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি করা সম্ভব হবে। আবার চায়ের উৎপাদন খরচ কমানো, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে চা–শিল্পে যান্ত্রীকরণ, উন্নত জাতের চা ক্লোন উদ্ভাবন, বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড চা তৈরি এবং চা ও চাজাত পণ্যের ওপর গবেষণায় নানা কার্যক্রম চলমান আছে। জাতীয় চা দিবসে আজ শুক্রবার খরাসহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল দুটি ক্লোন অবমুক্ত করা হচ্ছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চায়ের ব্যাপক চাহিদা থাকায় উৎপাদিত চা দ্রুততম সময়ে বিক্রি হচ্ছে। এটি চা উৎপাদনকারীদের উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করছে। ক্ষুদ্রায়তন চা চাষের মাধ্যমে ক্ষুদ্র চা–চাষিদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্রায়তন চা আবাদ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ক্ষুদ্রায়তন চা আবাদ সম্প্রসারণের জন্য বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।