
ফৌজিয়া খান : আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শুরুটা কীভাবে হলো?
ড. রফিকুল ইসলাম : এখন বাংলাদেশে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে, এটি কিন্তু শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পরপরই। বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটলে দেখবেন, পাকিস্তান সেখানে একটা মামলা করেছিল তাদের যুদ্ধবন্দীদের ফেরত নেওয়ার জন্য। ওই আদালতেও পাকিস্তান কিন্তু ওয়াদা করেছিল, তারা তাদের বিচার করবে।
আর বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে আমাদের জাতীয় সংসদ সর্বসম্মতিক্রমে একটা আইন পাস করে এবং সে আইনটিকে পরে স্পেশাল প্রটেকশন দেওয়া হয়েছে। সুতরাং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশে আজ যেটা হচ্ছে, সেটা নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এর একটা দৃঢ় এবং গভীর সংযোগ আছে। আন্তর্জাতিক আইনে ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ বলে একটা কথা আছে। একটা রাষ্ট্র, একটা জাতি যখন ভায়োলেন্স থেকে পিসফুল কমিউনিটি, সমাজ বা জাতি গঠনের দিকে যায়, তখন তারা ট্রানজিশনাল জাস্টিসের আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশে এখন যে বিচার হচ্ছে, এটা একটা ট্রানজিশনাল জাস্টিস, যা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক যেসব অপরাধ হয়েছিল, সেগুলো বিচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন পথে, শান্তির পথে যাত্রা করবে। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে ১৯৭২ সাল থেকে এ বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
ফৌজিয়া : আপনি পাকিস্তানের করা মামলা সম্পর্কে বিশদ করে কিছু বলবেন?
রফিকুল : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান যখন আত্মসমর্পণ করে, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন সদস্য যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন। তাঁরা ছিলেন প্রিজনার অব ওয়ার—তাঁরা প্রথমে ছিলেন বাংলাদেশের হেফাজতে। যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশন প্রযোজ্য। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধবন্দীকে নিরাপত্তা দিতে হয়। বাংলাদেশে যুদ্ধবন্দীদের নিরাপত্তার অভাব হতে পারে, এমন আশঙ্কা ভারতের ছিল। ফলে ভারত তখন ১৯৫ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীকে তাদের হেফাজতে নেয়। তারপর বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার পর বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলে। নিউইয়র্ক টাইমস-এ তখন একটা রিপোর্টও বেরিয়েছিল যে বাংলাদেশ ভারতের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে ওই ১৯৫ জনকে ফেরত পাঠানোর জন্য এবং ভারত তাতে নীতিগতভাবে রাজিও হয়। ওই সময় পাকিস্তান ভয় পেয়েছিল—১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীকে বাংলাদেশে হস্তান্তর করা হলে বাংলাদেশ তাঁদের বিচার করবে এবং বিচারে কী হতে পারে, পাকিস্তান সেটা ভালো করেই জানত। পাকিস্তান তার আন্তর্জাতিক সব মিত্রদেশ যেমন আমেরিকা, চীন, মধ্যপ্রাচ্যের সব মুসলিম দেশকে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে এবং বিষয়টাকে আন্তর্জাতিক আদালতে নিয়ে যায়। পাকিস্তান আদালতে বলেছিল, এই যুদ্ধবন্দীরা জেনেভা কনভেনশনের আওতায়। জেনেভা কনভেনশনে তাদের যে প্রটেকশন ও কাভারেজ পাওয়ার কথা, সেটা বাংলাদেশ দিতে পারবে না। সুতরাং কোনোভাবেই যাতে তাঁদের বাংলাদেশে না পাঠানো হয়, সেটা নিশ্চিত করতে কোর্টের আদেশ চেয়েছিল। দুই, তারা বলেছিল, ‘আমরা নিজেরাই এই যুদ্ধবন্দীদের বিচার করব।’ পরবর্তী সময়ে হামুদুর রহমান কমিশন পরপর দুটো রিপোর্ট করেছিল—প্রথমটাতে বলা হয়েছিল, পাকিস্তান আর্মি যেসব সম্পূরক অপরাধ করেছে, তাতে তাদের বিচার হওয়া উচিত।
ফৌজিয়া : যুদ্ধের পরপর আমাদের এখানে যুদ্ধাপরাধের বিচারের শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল?
রফিকুল : একাত্তরে পাকিস্তানের বন্ধুরাষ্ট্র তখন সমস্ত মুসলিম বিশ্ব, আমেরিকা, চীন। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় এরা সবাই কিন্তু বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বাধা দিয়েছে। জাতিসংঘ প্রতি মাসে একটা করে ক্রনিকল বের করে, ওটাকে বলে ইউএন মান্থলি ক্রনিকল। তাতে সেক্রেটারি জেনারেলের সারা বছরের বিবৃতি থাকে। সেক্রেটারি জেনারেল তখন উ থান্ট। একাত্তরে প্রকাশিত ইউএন ক্রনিকলগুলো পড়েন, দেখবেন, শুরুতে তার বিবৃতি শতভাগ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। আর একাত্তরের শেষে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, তখন সে যে বিবৃতি দিলেন, সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি প্রথমে বলেছিলেন, জাতিসংঘ কখনোই তার কোনো সদস্যরাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কোনো কিছু সমর্থন করবে না। কিন্তু একাত্তরের পর বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়ে গেল, তখন তিনি বলেছেন, আমাদের সদস্যের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা আমরা রক্ষা করব এটা ঠিক, কিন্তু আমাদের একজন সদস্য যদি ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিজেদের নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, তাহলে আমরা কী করতে পারি? তার মানে কী? এই যে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হলো, তার আগে একটা আন্তর্জাতিক আইন ছিল। আপনি যদি উপনিবেশবাদ থেকে একবার স্বাধীন হন, তাহলে আপনি আবার স্বাধীন হতে পারবেন না। বাংলাদেশ প্রথম রাষ্ট্র যে প্রমাণ করেছে, এটা সম্ভব। বাংলাদেশের সৃষ্টির পর ওই আইন বাতিল হয়ে গেছে। আজকের দিনেও একটা রাষ্ট্র ভেঙে আরেকটা নতুন রাষ্ট্র হতে পারে। বাংলাদেশের আগে যেগুলো হয়েছে, সেগুলো কিন্তু সব ব্যর্থ। ষাটের দশকে কঙ্গোতে, সত্তরের দশকে নাইজেরিয়াতেও ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ প্রথম স্বাধীন হয়েছে এবং গোটা আন্তর্জাতিক আইনকে বদলে দিয়েছে। আজ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে সমস্ত বাল্টিক স্টেট, লিথুনিয়া, লাটভিয়া—এরা সব স্বাধীন হয়ে গেছে। বলকান স্টেট যুগোস্লাভিয়া খণ্ড খণ্ড হয়ে আটটা রাষ্ট্র হয়েছে। সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশের অভ্যুদয় কিন্তু দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও আন্তর্জাতিক আইনের নিরিখে ইতিহাস হয়ে থাকবে।
ফৌজিয়া : আন্তর্জাতিক অন্যান্য ট্রাইব্যুনাল থেকে আমাদের ট্রাইব্যুনালকে আলাদা করে দেখছেন?
রফিকুল : আলাদা করছি। আপনি যদি বাংলাদেশকে ন্যুরেমবার্গের সঙ্গে তুলনা করেন, বাংলাদেশ কিন্তু এগিয়ে। যদি যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে তুলনা করেন, বাংলাদেশ এগিয়ে; যদি রুয়ান্ডার সঙ্গে তুলনা করেন, আমরা এগিয়ে। তারপর পূর্ব তিমুর, কিছুই হয়নি ওখানে! ইউএন জড়িত থাকলে কী হবে? হাজার হাজার আসামির অভিযোগ তদন্ত করে বিচার করতে পারেনি। কারণ, নিরাপত্তা পরিষদ তহবিল বন্ধ করে দিয়েছে। তারা ৪০০ জনের তদন্ত করেছিল, মাত্র ৮৪ জনের বিচার করতে পেরেছে। তারা একইভাবে ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যার যারা মূল হোতা ছিল, তাদের বিচার করতে পারেনি। কম্বোডিয়াতে তো এখন একটা তামাশা হচ্ছে। তারা ২০০৬ সালে শুরু করেছে। আজ ২০১৭—১০ বছর পার হয়ে গেল। মাত্র দুটো মামলার রায় হয়েছে। সুতরাং বিভিন্ন দিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশ তাদের থেকে ভালো।
ফৌজিয়া : আমরা দেশীয় আইনে আন্তর্জাতিক বিচার করছি। এতে বিশেষ সুবিধা আছে কি?
রফিকুল : সুবিধা হচ্ছে, আপনি আন্তর্জাতিক প্রভাব থেকে মুক্ত। আপনি যেখানে বিচার করছেন, অপরাধটা সেখানেই ঘটেছে। অপরাধী, সাক্ষী ও ভিকটিমদের সামনে বিচার হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ বিচারের সমস্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই বিচার যদি জেনেভাতে হতো, তবে বাংলাদেশের মানুষ এইভাবে সম্পৃক্ত হতে পারতেন না। আজ বিচার বিষয়ে অনেক লেখা বের হচ্ছে, বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রকাশিত হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ এর আইনি সব দিক জানতে পারছেন। যুগোস্লাভ ট্রাইব্যুনাল কেন সফল নয়? কারণ, বিচার হচ্ছে জেনেভাতে, যুগোস্লাভ জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তাঁরা মনে করেন না এতে তাঁদের আশা-আকাঙ্ক্ষার কোনো প্রতিফলন হচ্ছে। ইউএন তার মতো করে করছে।
কেনিয়ার ঘটনাটি ধরুন। কেনিয়ার মামলা আইসিসিতে গিয়েছিল। কিন্তু কেনিয়া সহযোগিতা করল না। বিচারও হলো না। যারা অপরাধী, তারা স্থায়ী দায়মুক্তি পেয়ে গেল। তো আন্তর্জাতিকভাবে হলেই যে বিচার হবে, এর কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাংলাদেশে হওয়াতে অন্তত এই নিশ্চয়তা আছে যে বিচার হচ্ছে এবং স্বাধীনভাবে হচ্ছে। আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করছি।
বাংলাদেশই এর বিচার করুক কিংবা আন্তর্জাতিক আদালত—যে অপরাধগুলোর বিচার হচ্ছে, সেগুলো কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অপরাধ। বাংলাদেশ নতুন কোনো অপরাধের বিচার করছে না। ইন্টারন্যাশনাল আইনে দেশীয় আইনের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল আইনের কোনো এনফোর্সমেন্ট অথরিটি নেই। রাষ্ট্রগুলোকেও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ করতে হয়। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো পুলিশ নেই, কোর্ট নেই। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস তো ইউনাইটেড নেশনের কোর্ট। ইউএনের যে ছয়টি মুখ্য সংস্থা আছে, তার একটা হলো ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস। তাদের শুধু আন্তর্জাতিক আইন আছে কিন্তু প্রয়োগের কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রয়োগের ব্যবস্থা সদস্যদেশকে করতে হয়।
বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে একটা আইন করেছে। এটি কী আসলে? এই যে আপনারা আমার সঙ্গে কথা বলছেন বা আমি কথা বলছি, কথাগুলো কীভাবে রেকর্ড হচ্ছে? একটা তারের মাধ্যমে হচ্ছে। এটাকে আমরা ইংরেজিতে বলি কনডুইট। তিয়াত্তরের অ্যাক্ট এমন একটা তার বা কনডুইট, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অপরাধগুলোকে একটা পাইপ বা তারের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে আসছে। বাংলাদেশ নিয়ে আসছে কেন? প্রয়োগ করার জন্য। বাংলাদেশ এটা করে আন্তর্জাতিক আইনকে সহায়তা করছে। যেটা আন্তর্জাতিক আইন গত ৪০ বছরে করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত যেসব আন্তর্জাতিক অপরাধ ১৯৭১ সালে সংঘটিত হয়েছে, বাংলাদেশ সেগুলোর বিচার করে আন্তর্জাতিক আইনকে সহায়তা করছে। আইসিসির প্রস্তাব বলেছে, সদস্যরাষ্ট্রগুলো বাধ্য বিচার করতে। তারপর আর্টিকেল ১৭–এ স্পষ্টভাবে বলা আছে, আইসিসির সদস্য একটা দেশ যদি ইচ্ছুক ও সমর্থ হয়, তাহলে তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অপরাধের বিচার করবে।
ফৌজিয়া : তাহলে কি আমরা বলতে পারি, আমাদের দেশীয় আইন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সম্পূরক?
রফিকুল : না, দেশীয় আইনই মৌলিক, ওদেরটাই সম্পূরক। কেননা রাষ্ট্রগুলো তো স্বাধীন ও সার্বভৌম। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস থেকে ডিফারেন্ট। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস একটা দেশের বিচার করে আর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট দেশের কোনো নাগরিকের বিচার করে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের পরিধি আমার-আপনার ওপরে, বাংলাদেশের ওপরে নয়। আমি-আপনি বাংলাদেশের নাগরিক। আমাদের ওপর কর্তৃত্ব বাংলাদেশের প্রথম।
ফৌজিয়া : আমাদের ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে আমরা কী কী যোগ করলাম, যা আগের কোনো ট্রাইব্যুনাল করেনি?
রফিকুল : নতুন করার ভেতরে কিছু কিছু ব্যাখ্যা তো আসছে। বাংলাদেশের অবদান, যেটা আমি বলব আপিল সিস্টেম। আন্তর্জাতিক আইনে আর যত আপিল সিস্টেম আছে, সেগুলো সব ইন হাউস। আইসিসির যেসব আছে—প্রি-ট্রাইব্যুনাল চেম্বার, ট্রায়াল চেম্বার, আপিল চেম্বার—একই বিল্ডিংয়ে; পদমর্যাদায় তিনটাই সমান। সেগুলো সব বিশেষ বিচারক দিয়ে করা। আমাদের আপিল সিস্টেমটা অনন্য। এখানে অন্য আর সব অপরাধীর মতো যুদ্ধাপরাধীদেরও সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী হিসেবে কোনো বৈষম্য করছে না; যেটা আর কোথাও নেই।
ফৌজিয়া : ধর্ষণ মামলার ব্যাপারটা?
রফিকুল : আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে ধর্ষণের কোনো সংজ্ঞা ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘কমফোর্ট উইমেন’–এর ঘটনাগুলো আপনারা জানেন। জাপানি ইম্পিরিয়াল আর্মির হাতে যাঁরা নিগৃহীত হয়েছেন, তঁাদের কমফোর্ট উইমেন বলা হয়। সেটা কিন্তু ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালেও তোলা হয়েছিল। কিন্তু তারা বলেছিল, এগুলো লঘু অপরাধ। দেশের প্রচলিত আইনেই এর বিচার করতে হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনালে পরিষ্কারভাবে তারা বলেছে, ধর্ষণের দুটি দিক থাকবে: একটা হচ্ছে, ধর্ষণ মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হতে পারে এবং ধর্ষণ গণহত্যারও অংশ হতে পারে। রুয়ান্ডায় হুতু চরমপন্থীরা তুতসি মহিলাদের যে ধর্ষণ করেছিল, তার উদ্দেশ্য কী ছিল? উদ্দেশ্য ছিল, জাতিগত বৈশিষ্ট্য বদলে দেওয়া। তুতসিরা আর থাকবে না। ফলে ধর্ষণ এখন একটা স্বীকৃত আন্তর্জাতিক অপরাধ, যেটা ১৯৯৮ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা বদলে দিল। সাত নম্বর ধারায় এটা পরিষ্কার বলা আছে, সব রকমের যৌন সহিংসতা মানবতাবিরোধী অপরাধ। সুতরাং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অপরাধ ধর্ষণের বিচার করতে গিয়ে বাংলাদেশ তার ব্যাখ্যা আরও স্পষ্ট করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধশিশু আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে।
ফৌজিয়া : আপনাকে ধন্যবাদ।
রফিকুল : আপনাকেও ধন্যবাদ।