
আসিফ বিন আলী। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কৌশলগত যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি এবং এ অঞ্চলের ভূরাজনীতি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাফসান গালিব
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি হলো। পেছনে ফিরে তাকালে এ অভ্যুত্থানকে কীভাবে দেখেন?
আসিফ বিন আলী: নব্বইয়ে দেশের রাজনৈতিক দল বা জোটগুলো এবং নাগরিকদের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে যে সামাজিক চুক্তি হয়েছিল, সেই চুক্তি যখন ভেঙে ফেলা হয়, তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেটি এই অভ্যুত্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জনগণের সঙ্গে গণতন্ত্রের সামাজিক চুক্তি যে রাজনৈতিক দলই ভাঙুক না কেন, সময় এলে জনগণ রাস্তায় নেমে আসবে এবং সেই রাজনৈতিক ক্ষমতাকে তার ক্ষমতা থেকে দূরে ছুড়ে ফেলে দেবে। জুলাইকে আমি এভাবেই দেখতে চাই।
বিগত দশকগুলোর অন্যান্য গণ–আন্দোলন বা গণ-অভ্যুত্থানের তুলনায় চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে বড় ধরনের নিষ্ঠুরতা বা ভায়োলেন্স ঘটেছে। আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ সরকার ও রাষ্ট্র চরম ভায়োলেন্স ঘটিয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে পাল্টা ঘটনাও ঘটেছে। এখন দেখতে হবে, যখন জুলাইয়ের পরে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো এবং একটা নতুন নির্বাচিত সরকার এল, তারা কি এই ভায়োলেন্সকে আইনের দৃষ্টিতে দেখেছে, নাকি উপেক্ষা করছে।
বাংলাদেশের সমাজে বরাবরই রাজনৈতিক ভায়োলেন্সের বিচার উপেক্ষিতই থেকে যায়, সেই অর্থে বিচার হয় না। ফলে ভুক্তভোগীদের মানসিক উপশমের কোনো জায়গা থাকে না। রাষ্ট্রকে ভুক্তভোগীদের পরিচয় নির্বিশেষে তাদের ক্ষয়ক্ষতিকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং তাদের মানসিক উপশমের ব্যবস্থা করতে হবে। আর এটি করার একমাত্র পথ হলো ন্যায়বিচার। সরকারকেই সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আর এটা না হলে সমাজে স্থায়ী শান্তি বা স্থিতিশীলতা আসবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে নানা আলোচনা আমরা দেখি। আপনার মূল্যায়ন কী?
আসিফ বিন আলী: সে সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল সমাজে স্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একটি সঠিক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এখানে তাদের বড় সফলতা হলো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা। যদিও সে সরকারসহ সেনাবাহিনী ও বিএনপি—এই তিন পক্ষই নির্বাচনের ব্যাপারে অত্যন্ত অনড় অবস্থানে ছিল এবং এই সাফল্যে সবার অবদান স্বীকার করতে হবে।
বড় ব্যর্থতা হলো, গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের যে বিপুল সমর্থন তারা পেয়েছিল, তার সঠিক ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ না রেখে সেটিকে জামায়াতীকরণের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল। যদিও সরকারের ভেতরে কিছু ডানপন্থী এলিমেন্টের পাশাপাশি কিছু সেক্যুলার এলিমেন্টও ছিল, এরপরও জামায়াতের প্রভাবটা ছিল বেশি। সে সরকার যে সংস্কার বা জবাবদিহির কথা বলেছিল, তা তারা নিজেদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেনি।
এখন বিএনপি সরকার এসে সেই জামায়াতীকরণ পরিবর্তন করে সবকিছু বিএনপিকরণের দিকে হাঁটছে। এখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের শাসন আমরা দেখলাম না। মেধা ও যোগ্যতার আলাপটি ক্ষমতার প্রতি আনুগত্যের আলাপে রূপ নিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে গুণগত পরিবর্তন আসার কথা ছিল, সেটি এখানে বড় ধাক্কা খেল।
রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে বলবেন?
আসিফ বিন আলী: সংস্কারের আলাপটা আসলে আরও আগে থেকে এখানে ছিল। এ অভ্যুত্থানের কারণে সেটি বরং মনোযোগের বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মানুষের মধ্যে একটা প্রত্যাশা তৈরি হয় যে রাষ্ট্র আরও বেশি মানবিক হবে, প্রতিষ্ঠানগুলো সচল হবে, গণতন্ত্র আরও মসৃণ হবে এবং জবাবদিহি তৈরি হবে। কিন্তু আমি মনে করি, রাষ্ট্র সংস্কারের মূল দায়িত্ব কোনো অনির্বাচিত প্রতিনিধি বা অন্তর্বর্তী সরকারের নয়। তাঁরা একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে এসেছিলেন এবং তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল দ্রুততম সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।
অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন কমিশনের মাধ্যমে বেশ কিছু সংস্কারের কর্মপরিকল্পনা বা প্রস্তাব তৈরি করেছিল। তাদের সদিচ্ছা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই, তবে তাদের প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল। সিভিল সোসাইটি থেকে আসা সদস্যরা নিজেদের সংস্কারের একমাত্র ধারক-বাহক এবং রাজনীতিবিদদের সংস্কারবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। এতে করে আলোচনাগুলো মেকি পর্যায়ে চলে যায়।
রাজনীতিবিদেরা কৌশলগত অবস্থান নেন যে এতে বাধা দিলে নির্বাচন পিছিয়ে যাবে, আর অরাজনৈতিক উপদেষ্টারা ভাবেন তাঁদের কৌশল সফল হচ্ছে। এই দ্বন্দ্বে রাজনীতিবিদেরাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন। ক্ষমতা পেয়ে তাঁরা সংস্কারের অনেক প্রস্তাব যেমন স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বা মানবাধিকার কমিশনের মৌলিক ভিত্তিগুলোকে এক পাশে সরিয়ে রেখেছেন। ফলে মনে হতে পারে, আমরা আবারও আগের অবস্থানে ফিরে গেছি।
বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নানা আলোচনা দেখা যাচ্ছে। এখানে স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি জোরালোভাবে প্রাসঙ্গিক। সরকারের পররাষ্ট্রনীতির কোনো স্পষ্ট অভিমুখ দেখতে পাচ্ছেন কি?
আসিফ বিন আলী: বর্তমান সরকার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বলছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। মানে সবার আগে দেশের স্বার্থকে এগিয়ে রাখা। এটি সব দেশের সব সরকারই বলে থাকে। কিন্তু বিএনপি সরকারকে তার এই নীতির বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট করতে হবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক আলোচনা বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা আসলে কী করতে চায়। বাংলাদেশ কি একটি রুল বেজড ফরেন পলিসি (নিয়মভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি) অনুসরণ করবে নাকি অন্য কিছু, তা এখনো অস্পষ্ট।
বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতি ব্যাপকভাবে যুক্ত। বর্তমানে ভারতের প্রতি তীব্র বিরোধিতা যেমন রাজনৈতিক মাঠে জনপ্রিয়, তেমনি আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর নীতিও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। আবার দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে সম্পর্ক বিস্তৃত করার বিষয়টিও সফল হয়নি। আসিয়ান বলে দিয়েছে, বাংলাদেশ আসিয়ানের সদস্য হতে পারবে না।
বর্তমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং প্রেডিক্টেবল বা পূর্বাভাসযোগ্য নয়। একটি পরিপক্ব পররাষ্ট্রনীতিকে অবশ্যই পূর্বাভাসযোগ্য হতে হয়, যাতে অন্য রাষ্ট্রগুলো আমাদের অবস্থান বুঝতে পারে। পররাষ্ট্রনীতিকে সস্তা জনপ্রিয়তাবাদের ওপর ছেড়ে না দিয়ে নিয়মভিত্তিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে হবে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে আমাদের একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কী মনোভাব দেখতে পাচ্ছেন?
আসিফ বিন আলী: ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একধরনের ডিসকমফোর্ট বা অস্বাচ্ছন্দ্য এবং কানাঘুষা তৈরি হয়েছে। এটি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজের স্বার্থের দিক থেকে পরিস্থিতি বিবেচনা করবে। কিন্তু আমাদের দেশের স্বার্থে আমাদের চীন, ভারত, আমেরিকা, রাশিয়া সবার সঙ্গেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
আমেরিকার বৈশ্বিক পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে এখানে তার বড় স্বার্থগত জায়গা হচ্ছে, বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনকে ঠেকানো। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে চীনের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই ত্রিমুখী সমীকরণের মাঝে বঙ্গোপসাগরে মুক্ত ও নিরাপদ প্রবেশাধিকারের জন্য বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে।
এই অবস্থায় বাংলাদেশ যদি চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা দেখায়, তবে আমেরিকা তার যাবতীয় প্রভাব খাটিয়ে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে বাংলাদেশের প্রধান নিরাপত্তাকবচ হলো নিজের পররাষ্ট্রনীতিকে পূর্বাভাসযোগ্য ও নীতিগত স্বচ্ছতা বজায় রাখা।
চীন যে অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছে, এটির ভবিষ্যৎ কী দেখছেন?
আসিফ বিন আলী: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই করিডরে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। কারণ, এটি করলে মার্কিন ও ভারতীয় পক্ষ একজোট হয়ে এর বিরোধিতা করবে, যা সরকারকে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংকটে ফেলবে। তদুপরি, এই করিডরটি মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে বর্তমানে তীব্র গৃহযুদ্ধ চলছে এবং সেখানে চীন, ভারত ও আমেরিকার নিজ নিজ স্বার্থ জড়িত। বিশেষ করে এই করিডর যেখান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে, সেখানে ভারতের স্বার্থ অনেক গভীর। তাই এর ভূরাজনৈতিক জটিলতা অনেক বেশি।
অনেকে মনে করেন যে এই করিডর বাস্তবায়িত হলে চীন বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবে, কিন্তু আমি এই ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। রোহিঙ্গা ইস্যুটি অত্যন্ত জটিল। অতীতে চীন রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সর্বদা মিয়ানমার সরকারকেই সমর্থন দিয়ে এসেছে। ফলে এটি কেবল একটি করিডরের মাধ্যমে সমাধান হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমাধানও অত্যন্ত সুদূরপরাহত এবং যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রোহিঙ্গা ইস্যুটি আমাদের জন্য এমন একটি জটিল ধাঁধা, যার নিশ্চিত সমাধান কারও জানা নেই।
ভারতে শেখ হাসিনার বক্তব্য ধরে নতুন করে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে উত্তাপ দেখা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ভারতের অবস্থান ও তাদের ব্যাখ্যাকে কীভাবে দেখেন?
আসিফ বিন আলী: বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ইস্যুটি এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা, যাকে আমি ‘হাসিনা ব্লক’ বলি। শেখ হাসিনা ভারতে বসে যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন, তা ভারতের সম্মতিক্রমেই হচ্ছে এবং তা স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। বাংলাদেশ ও ভারত নিজেদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইলেও প্রতিবারই এই হাসিনা ইস্যুতে এসে তা আটকে যাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা সামনে আরও ঘটবে। এর ফলে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্থবিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলেও দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই চলমান থাকবে।
আর গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, সীমান্ত পরিস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে কূটনীতিতে বাংলাদেশকে দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে ভারত একটি ওয়াটার হেজিমনি রাষ্ট্র এবং সক্ষমতার দিকেও তারা এগিয়ে। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে শুধু এজেন্ডা নির্ধারণ দিয়ে তার সঙ্গে দর-কষাকষি করে সুবিধা করা যাবে না, এখানে আলোচনার টেবিলে সুবিধা পেতে চাইলে একাডেমিক গবেষণা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।
আর সীমান্তের অস্থিরতার মূল দায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর বর্তায়। সেখানে বাংলাদেশি বিতাড়নের যে রাজনীতি চলছে, তারই প্রতিফলন ঘটে সীমান্তে। সীমান্ত ইস্যুতে উভয় দেশকেই বুঝতে হবে, দুই দেশের সীমান্ত যুদ্ধকেন্দ্রিক সীমানার মতো না। এখানে এমনও পরিস্থিতি আছে, এক বাড়ির উঠোন বা রান্নাঘর আরেক সীমান্তে পড়েছে। ফলে দুই দেশকেই এখানে সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় এক অবস্থানে আসতে হবে।
ভারতে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকে কীভাবে দেখছেন?
আসিফ বিন আলী: শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত এনে বিচারের মুখোমুখি করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ, প্রতিবেশী মিত্র রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে ভারত তার দীর্ঘমেয়াদি নীতি থেকে সরে আসবে না। ভারত নিজেও জানে যে শেখ হাসিনার আবার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসা অসম্ভব। তবে তারা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নতুন নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী হতে পারে। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে, সেখানে শেখ হাসিনা বা তাঁর সহযোগীদের রাজনীতিতে সহজভাবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগই অবশিষ্ট নেই।
দুই বছর ধরে আওয়ামী লীগ তাদের রাজনৈতিক প্রচারে কেবল প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ওপর জোর দিয়েছে এবং নিজেদের দ্বারা সংঘটিত সহিংসতার দায় সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে গেছে। নিজেদের ভিকটিম হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য তারা এই কৌশল নিয়েছে। কিন্তু তাদের বিগত ১০ বছরের স্বৈরতন্ত্র, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন বানচাল করে জনগণের সঙ্গে গণতন্ত্রের সামাজিক চুক্তি ভঙ্গ করার বিষয়টি নিয়ে তারা সম্পূর্ণ নীরব। দলটির আত্মসমালোচনা না করে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ওপর ভর করে থাকার এই প্রবণতা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বাংলাদেশের রাজনীতির বড় ট্র্যাজেডি হলো, বিগত ৫৫ বছরের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের ভুলের দায় স্বীকার করে না, বরং একধরনের অস্বীকারের মানসিকতায় ভোগে। স্বৈরাচার এরশাদ প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারানোর পরও কোনো দিন ক্ষমা চাননি, জামায়াত একাত্তরে গণহত্যায় সম্পৃক্ততার বিষয়েও সরাসরি নিজেদের ভুল স্বীকার করে কোনো আত্মশুদ্ধি করেনি এবং আওয়ামী লীগও তাদের রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের ভুল স্বীকার করবে না। কারণ, আমাদের রাজনীতিতে ভুল স্বীকার করার সংস্কৃতি নেই। রাজনীতিবিদেরা মনে করেন যে ভুল স্বীকার না করেও যদি আবার ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া যায়, তবে তারা কেন তা করবেন? মাঝখান থেকে সাধারণ জনগণ ও ভুক্তভোগীরা এক দীর্ঘমেয়াদি ট্রমার মধ্যে থাকতে বাধ্য হয়।
আপনাকে ধন্যবাদ।
আসিফ বিন আলী: আপনাকেও ধন্যবাদ।